“আদমি, আদমি কো ক্যা দেগা
যো ভি দেগা, বহ্ হি খুদা দেগা...”
ভক্তের এই চিরকালীন আকুতি পরের পঙতিতে এসে কোথায় যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। সুদর্শন ফকিরের কলম চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল -
“মেরা কাতিল হি, মেরা মুন্সিব হ্যায়
ক্যা মেরে হক্ মে, ফয়সালা দেগা...”
[কাতিল=খুনি, মুনসিব (মুন্সিফ)=বিচারক, হক্=অধিকার]
-----------------------------------------------------------------
১৯৯০ সালের ২৮ জুলাই, এক প্রবল বৃষ্টির দিনে, জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিং-এর একমাত্র সন্তান বিবেক বম্বের রাস্তায় এক মারাত্মক গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে নিহত হয়, মাত্র ১৮ বছর বয়সে। সেই বয়সেই গজলের প্রতি তীব্র আকুতি ছিল তার। সেই আকুতি আর পারিবারিক পরিবেশ থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন প্রতিভা, যা হয়ত তার বাবা-মা’র মতনই একদিন জগৎ জুড়ে গজলপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থান করে নেবে। কিন্তু সব কিছুই মুছে গেল এক নিমেষে। আকাশ কালো করা এক ঝড়ে ধস্ত হয়ে গেলেন জগজিৎ-চিত্রা।
পরের বছরে বেরোল একটি গানের অ্যালবাম, Someone Somewhere. আকুতি, হতাশা, ভালোবাসা, অন্তহীন প্রশ্ন এবং সীমাহীন বিষণ্ণতায় ডুবে থাকা আটটি গজল যেন এক নিরালা বেলাভূমিতে একলা পায়ের চলাচল। সমুদ্রতীর জুড়ে উন্মাদ মেঘের গোধুলী। জগজিৎ-চিত্রার ভক্তদের হৃদয় তখন নির্ঘুম।
এই অ্যালবামটি জগজিৎ-চিত্রা যুগলের করা শেষ অ্যালবাম। এর পরে চিত্রা আর কোন গানের অনুষ্ঠানে অংশ নেননি কোনদিন। ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন নিজেকে সবকিছুর থেকে।
-----------------------------------------------------------------
ফনা নিজামি কানপুরি-র কলমে জগজিৎ যেন প্রশ্ন করছেন -
“উনকি ইক্ নজর, কাম কর গয়ি
হোঁশ অব্ কাঁহা, হোঁশিয়ার মে...”
সেখানে চিত্রার গলায় বিনম্র সমর্পন -
“মেরে কবজ্ মে কায়নাত হ্যায়
ম্যায় হুঁ আপকে ইখতিয়ার মে...”
পরের পঙতিতে যখন জগজিতের গলায় বেদনা -
“আঁখ তো উঠি, ফুল কি তরফ্
দিল উলঝ্ গ্যয়া হুসন-এ-খ্যার মে...”
তখন চিত্রা-র গলায় তীব্র হতাশা ঝরে পড়ছে -
“তুঝসে ক্যা কহে, কিতনে গম সহে
হামনে বে-ওয়াফা তেরে পেয়ার মে...”
[কায়নাত=বিশ্ব/ব্রহ্মাণ্ড, ইখতিয়ার=নিয়ন্ত্রণ, উলঝ্=জটিল/খারাপ , হুসন-এ-খ্যার=অপরূপ সৌন্দর্য, বে-ওয়াফা=অবিশ্বাসী]
মুজাফ্ফর ওয়ারশি-র লেখা শায়েরিতে, জগজিতের উদাস কণ্ঠে যখন -
“মেরি জিন্দেগী কিসি অউর কি
মেরে নাম কা কোই অউর হ্যায়
মেরা অকশ্ হ্যায় সর-ই-আইনা
পাস-ই-আইনা কোই অউর হ্যায়।
মেরি ধড়কনো মে হ্যায় চাপ-সি
ইয়ে জুদাই ভি হ্যায় মিলাপ-সি
মুঝে ক্যা পতা মেরে দিল বাতা
মেরে সাথ ক্যা কোই অউর হ্যায়...”
[অকশ্=প্রতিবিম্ব, সর-ই-আইনা=আয়নার সামনে, পাস-ই-আইনা=আয়নার পিছনে, চাপ=পদচ্ছাপ, মিলাপ=মিলন]
তখন মায়ের হৃদয়ের চিরন্তন যন্ত্রনা, ব্যথা তীব্র আকুতি নিচ্ছে সুদর্শন ফকিরের কথা-সমষ্টি ঘিরে, চিত্রা-র গানে -
“মেরে দুখ্ কি কোই দাবা না করো
মুঝকো মুঝসে আভি জুদা না করো।
না-খুদা কো খুদা কাঁহা হ্যায় তো ফির্
ডুব যাও খুদা-খুদা না করো...”
[দাবা=স্বত্ত]
তবু এক আকাশ কালো মেঘ আর ঝোড়ো হাওয়াকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে দিনরাত্রির কঠিন হিসাব নিকাশ। শামীম কারহানি-র লেখায় দুজনে মিলে গেয়ে ওঠেন -
“কস্তিয়াঁ নেহি তো ক্যা, হৌসলে তো পাস হ্যায়
কহে দো না-খুদা উসে, তুম কোই খুদা নেহি।
লিজিয়ে বুলা লিয়া, আপকো খয়াল মে
অব্ তো দেখিয়ে হামে, কোই দেখতা নেহি।
আই-এ চরাগ-এ-দিল, আজ হি জ্বলায়ে হম্
ক্যায়সি কাল হাওয়া চলি, কোই জানতা নেহি।”
[কস্তি/কস্তিয়াঁ=নৌকা, হৌসলে=মনের জোর/উৎসাহ, আই-এ=এই মুহূর্তে, চরাগ-এ-দিল=হৃদয়ের মৃদু আলো]
সত্যিই তো, আজকের জীবনের আলো, খুশির মুহূর্ত কালকের কোনও ঝোড়ো হাওয়া এসে নিভিয়ে দেবে কিনা, কেউ কি জানি?
------------------------------------------------------------------
জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিং-এর এক গুণমুগ্ধের, তাঁদের প্রতি সশ্রদ্ধ নিবেদন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন