সাদারঙের সুইফট ডিজায়ারটা ধীরে ধীরে
থেমে গেল। ছাতিম গাছের পেছনের ছায়া থেকে বেরিয়ে এল শতদ্রু। হাত দিয়ে পেছনের সীটের
বাঁদিকের দরজাটা আস্তে করে খুলল। ৪১ ডিগ্রির তপ্ত চারপাশ এসির ঠান্ডা হাওয়ায়
মিলিয়ে গেল। চালক গাড়িটা স্টার্ট দিতে ডানদিকে ঘাড় ঘোরাল শতদ্রু। একটা ইয়াব্বড়
রোদচশমায় মুখের আদ্দেকটা ঢেকে স্নেহা বসে আছে। ঘাড়টা ঈষৎ হেলিয়ে বাঁ চোখের কোন
দিয়ে শতদ্রুকে দেখল স্নেহা। শতদ্রুর মুখে বিজবিজে ঘাম জমে আছে।
- মুখটা মুছে নাও।
- অ্যাঁ, হ্যাঁ হ্যাঁ।
শরীরটা একটু কেত্রে পকেট থেকে রুমাল
বের করে মুখটা ভাল করে মুছল শতদ্রু।
স্নেহার বাঁহাতটা এগিয়ে এল, একটা
ঠান্ডা কোকের ক্যান ধরা সে হাতে।
চাউলপট্টি রোডটা এই প্রথম বিকেলে বেশ
ফাঁকা। কোকটা শেষ করে জানলার কাঁচটা নামিয়ে ক্যানটা ফেলার জায়গা খুঁজছিল শতদ্রু। একটা
সেরকম জায়গা পেয়ে ক্যানটা ছুঁড়ে দিতে গিয়ে সামনের দেওয়ালে চোখ পড়ল, আসন্ন বিধানসভা
নির্বাচনে বেলেঘাটা কেন্দ্রে ...। কাঁচটা তুলে দিয়ে স্নেহার দিকে ঘুরে বসল শতদ্রু।
ডান হাতের চেটোর উল্টোদিকে মুখটা ঢেকে অল্প ঢেঁকুর তুলে বলল, ওহ্, থ্যাঙ্কস ফর
কোক।
বাঁহাতের তর্জনী দিয়ে স্নেহা রোদচশমাটা
একটু নামিয়ে বাঁচোখটা সামান্য নাচিয়ে বলল, আমার কাজগুলো এমনই, এভাবেই সারাজীবন
দিতে হবে।
- তাই তো দিয়ে যাচ্ছি, কবে থেকে!
বাইপাস পেরিয়ে গাড়িটা সল্টলেকে ঢুকে
পড়ল। এবার রাস্তায় একটু গাড়ির সংখ্যা বাড়ল।
- আঙ্কেল কেমন আছেন?
- একইরকম। যেরকম থাকে আর কি!
একটু চুপ করে থেকে শতদ্রু বলল, ওঁর
এই ডিপ্রেসনটা যে কিভাবে যাবে। সারাদিন কি জমিটার কথাই ভাবেন?
- ওটা সারা জীবনেও মনে হয় যাবেনা।
ডাক্তার যতই বলুক।
- আমি এই নিয়ে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে
কথা বলেছিলাম। অয়ন। ও বলল, ওর একজন চেনা আছেন, খুবই চেনা। ক্লিনিকাল
সাইকোলজিস্ট। তিনি নাকি...
কথা শেষ করতে না দিয়ে স্নেহা বলল,
ছাড়, এনিয়ে শুধু শুধু ভেবনা।
- কি বলছ, ভাবব না, যতই হোক আমার উড
বি শ্বশুরমশাই।
- ছাড়, শতদ্রু।
টেকনোপলিসের সামনের ভিড়টা ছাড়িয়ে এসে
বক্সব্রিজে উঠে নিউটাউন নামার মুখে ড্রাইভার জিগ্যেস করল, ম্যাডাম কিধার যাউঁ?
- সিধা। এক্সপ্রেসওয়ে বরাবর।
ইকোপার্কের সামনে দুটো ছেলে মেয়ে
রাস্তা পেরোতে গিয়ে আরেকটু হলে গুবলেট করে দিয়েছিল। ড্রাইভার পাকা হাতে সামাল দিল
ব্যাপারটা। একবার বাইরের দিকে তাকাল শতদ্রু। একটু দুরে মাঠে তিন চারটে গরু ঘাস
খাচ্ছে। আকাঙ্খ্যা মোড় দেখতে পেয়ে স্নেহা ড্রাইভারকে বলল, আইল্যান্ড ঘুমাকে সিধা
যানা হ্যায়। আকাঙ্খ্যা মোড় পেরনোর সময়
গাড়ির সামনে একটা এনফিল্ড চলে এল। এই গরমেও লোকটা কালো টিশার্ট পরেছে! মোড় পেরিয়ে
উত্তর দিকে ওদের গাড়িটা চলতে লাগল। শতদ্রু বাইরের দিক থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে নিয়ে স্নেহার
কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, প্রোটেকশনটা এনেছ তো?
- হুঁ। ব্যাগে আছে।
আরও ফিসফিস করে, কানের ভেতরে মুখ
নিয়ে বলল, বেডশিটটা?
একটু থেমে, স্নেহা চাপাস্বরে বলল, টাওয়েল
এনেছি। হবেনা?
স্নেহার হাতে আলতো চাপ দিয়ে বলল,
হুঁ।
- ডাইনে মোড় লেকে থোড়াসা আগে।
ড্রাইভার সামনের আইল্যান্ড ঘুরে ডান
দিকের রাস্তায় গাড়িটা ঘুরিয়ে দিল। বেশ কিছুটা যেতেই, স্নেহা নির্দেশ দিল, বাঁয়ে
তরাহ্। বাঁ দিকের রাস্তায় ঢুকে আবার ডানদিকে মোড় নিল গাড়িটা, স্নেহার নির্দেশে। পরপর
বেশ কয়েকটা নির্মীয়মান আবাসন প্রকল্প। ফাঁকা ফাঁকায় দাঁড়িয়ে
আছে। স্নেহার কথায় একটার গেটের সামনে গিয়ে গাড়িটা দাঁড়াল।
- গাড়ী ঘুমা লেনা অউর তুম এঁহিপর
রহেনা।
- জী।
গাড়ি থেকে নেমে শতদ্রু দেখল আবাসনটা
বেশ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। শতদ্রু চাপাস্বরে বলল, এটাই সেই জমি?
- হুঁ।
- তাহলে প্রোমোটারকে আজও খুঁজে পাওয়া
গেলনা!
- পেয়েছি, অবশেষে।
গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে, বাঁদিকে
সিকিউরিটির ঘর। সেখান থেকে একটা লোক বেরিয়ে এল। স্নেহা গিয়ে তার সঙ্গে কিছু কথা বলল।
তারপর, ব্যাগ খুলে মুঠো করে কিছু দিল। লোকটা সেটা নিয়ে পিছু ফিরল। স্নেহা পিছন
ফিরে শতদ্রুর দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়িয়ে হাঁটা শুরু করল। শতদ্রু দ্রুত পায়ে এসে স্নেহার
পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। পাঁচটা উঁচু টাওয়ার প্রায় তৈরী আর
দুরে কিছু বাংলো টাইপ তৈরী হচ্ছে।
- কোনটা?
- চার নম্বর। সেভেন্থ ফ্লোর।
সিঁড়ি দিয়ে আটতলায় উঠে দুজনে বেশ
কিছুক্ষণ হাঁফাতে থাকল। স্নেহার মুখের দিকে তাকাতে, ও ডানদিকে আঙুল তুলল। ডানদিকে
ঘুরে, কিছুটা তৈরী অংশ পেরিয়ে খোলা জায়গায় এসে দাঁড়াল ওরা। শতদ্রুর চোখদুটো যেন
চকচক করছে। সামনে খোলা আকাশ। দূরে ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। স্নেহা এগিয়ে এল। চোখ থেকে রোদচশমা খুলে ফেলেছে ও। সামনের থাক করে রাখা
ইঁটের পাঁজার দিকে চোখের ইশারা করল। শতদ্রু পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ইঁটের পাঁজার
দিকে।
- ডানদিক থেকে ছ’নম্বর। ওপর থেকে তিন।
শতদ্রু ওর কথা মতো ইঁটের পাঁজায় আঙুল
ঠেকিয়ে গুনতে লাগল। নির্দিষ্ট জায়গায় এসে একবার থামল। তারপর বুড়ো আঙুল আর তর্জনী ও
মধ্যমা দিয়ে ইঁটটা বার করতে লাগল। বেশ কিছু চেষ্টার পর ইঁটটা বার করে ফেলল। আস্তে
করে নিচে নামিয়ে রেখে আবার উঠে দাঁড়াল। তারপর, পাশের ইঁটটাও একইভাবে বার করে নিচে
রাখল। স্নেহার দিকে ফিরে চাপাস্বরে বলল, প্রোটেকশনটা বার করে হাতে রাখ। স্নেহা ব্যাগ খুলে ধুসর রঙের পিস্তলটা বার করল। পাঁজার মধ্যে যে ফোকর হল,
সেটার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিল শতদ্রু। কব্জি পর্যন্ত হাত
ঢুকিয়ে থামল। তারপর একটা রুপোর ঢাকা দেওয়া পাত্র সাবধানে বার করে আনল। ওর চোখ দুটো
তখন চকচক করছে। নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে স্নেহার দিকে তাকাল, টাওয়েলটা
দাও। স্নেহা ব্যাগ থেকে টাওয়েলটা বার করে এগিয়ে গিয়ে একহাতে মেঝেতে বিছিয়ে দিল। দু’হাতে
রুপোর পাত্রটা সাবধানে ধরে, শতদ্রু পা মুড়ে স্নেহার দিকে পেছন করে টাওয়েলের ওপর
বসে পড়ল। ডানহাত দিয়ে ঢাকনাটা খুলে মাটিতে নামিয়ে রাখল। তারপর, মুখ নামিয়ে পাত্রটা
থেকে ঈশ্বরের ঘাম মেশানো রক্ত পান করতে থাকল। ঠিক দশ সেকেন্ড পর স্নেহা দু’পা এগিয়ে,
শতদ্রুর বাঁ কানের ঠিক পাশে পিস্তলটা ঠেকিয়ে ট্রিগারটা টেনে দিল। গুলির ধাক্কায়
মাটিতে ছিটকে পড়ল শতদ্রুর দেহটা। তারপর, কিছুক্ষণ ছটফট করে নিথর হয়ে গেল।
স্নেহা নিচে নেমে এসে, গেটের কাছে
আসতে সিকিওরিটির লোকটা এগিয়ে এল। ব্যাগ খুলে ওর হাতে কাগজে মোড়া টাকার বান্ডিল
দিয়ে কাঁধের ওপর ফেলে রাখা টাওয়েলটা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে গেট খুলে বাইরে এল। দেখল
গাড়িটা ঘুরিয়ে দাঁড় করানো আছে।।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন