বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

একলা নাবিকের ডিঙি


এইতো গতকাল বেলাভূমি ছেড়েছি। জেটির গায়ে লেগে আছে নির্ঘুম জীবনযাপন। আমার না-কথা বলা রাত্রি, দুটোমাত্র ঝিনুক আর অসংখ্য হাওয়ার ঢেউ মিলেমিশে গিয়েছিল। ঝাউগাছের পাতা বেজে উঠেছিল খিলখিল শব্দে বালিয়াড়ি ধরে পায়ের ছাপ হেঁটে গিয়েছিল বহুদূর। সমস্ত তীর জুড়ে তখন উন্মাদ গোধুলী নাবিক হয়েও কোন বন্দরে আমার বউ নেই কোনদিন

মাঝসমুদ্রের গাঢ় নীল মিশে গেছে কালো রঙে। সীগালের ডানায় ভর করে নেমে আসছে নিঝুম সন্ধ্যা। তারপর ফুটকি ফুটকি বিন্দু। ওপরের ডেকে চিত হয়ে শুয়ে আছি একা। এখন তুমি সঙ্গে থেকো। চেপে ধরে রেখো আমার হাতটা আর তোমার ভেজা চুলের জলের ফোঁটা আমার মুখজুড়ে থাকুক। আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে কি চেয়েছিলাম কিছু?


সেই দুষ্টুমির সন্ধ্যা। সেই আকাশের নিভে আসা। সেই আগুন জ্বালিয়ে ম্যান্ডোলিন। চারিদিক খোলা বেলাভূমিতে নিঃশব্দ আড়ালে রেখেছিল আমাদের। পাতার পোষাক পরে নেচেছিলে তুমি। চিতল হরিণী ঘাই মেরেছিল আমার বুকে। তোমাকে ধরতে গেলে খিলখিল হেসে বালিয়াড়ি পেরিয়েছিলে দ্রুতস্বরে। তারপর কুটিরের ভেতর আগুন জ্বালিয়েছিলে একটু একটু করেতোমার কালো খোলা চুলে কি ছিল? আমি পুড়ে মরেছিলাম সারাটারাত!

তারপর কতদিন হয়ে গেল। প্রিয় ম্যান্ডোলিনে সুর তুলতে তুলতে দেখতাম কমলারঙা সমুদ্র-পোশাকে লেগুন জুড়ে মৎসকন্যাআমি আনমনে আঁক কাটতাম বালিতে। প্রিয় ডলফিনের সঙ্গে খেলা করতে করতে দুপুর হয়ে যেত তোমার নিঝুম দুপুরে কেয়াপাতার নৌকো গড়তে বড়। সেই অলস সময়ে আমার কোন সঙ্গী ছিলনা, তুমি ছাড়া।

এক আকাশ মেঘ ছিল। আর তীব্র ঝোড়ো হাওয়া। জাহাজ দুলেছিল খুব। কালো জলের ছিটে লেগেছিল চোখেমুখে। এত বড় ঢেউ আমি নাবিক-জীবনে দেখিনি। সেই ঢেউএর মাথায় বাতি দেখেছিলাম যেন! নাকি ওটা ঈশান কোণের নক্ষত্র ছিল!

কমলা রঙের ভোর লেগে আছে নোঙরের গায়ে। আর জলে ভেসে থাকা কাছি জুড়ে অজস্র রঙিন মাছের স্রোত। নোনা হাওয়ায় চোখমুখ জুড়িয়ে যাচ্ছে খুব। দুহাতে ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার পরনে সাদা পোষাক। মাথায় সাদা টুপি। পায়ে পালিশ করা চকচকে কালো জুতো। নিখুঁত দাড়িকাটা গাল থেকে চুঁইয়ে পড়ছে নীলাভ পৌরুষ। আমার বিষাদমাখা চোখের গভীরে কোন তল নেই বহুদিন হল।

প্রবালদ্বীপে ঘর ছিল একমাত্রিক। সমুদ্রসবুজ জলের ভেতর থেকে রোজ তুলে আনতাম পান্না-সাদা কোরাল আর মিঠে নীল সকাল। আমার সঙ্গে ভেসে উঠত বুদবুদ কাটা জলের পাপড়ি। চৌখুপি রোদ গান গেয়ে উঠত হাসিরাশি সকালে। কাঠের টেবিলে ব্রেকফাস্ট দিতে তুমি। মাশরুম স্যান্ডউইচ আর খুশবু ওঠা কালো কফি। তারপর সিগারের মুখ ছিঁড়তাম আনমনে। নুয়ে পড়া নারকোল গাছে হ্যামক বাঁধতে বাঁধতে কখনও কি ভেবেছিলাম আমি একলা হব!

অবকাশ ভেঙে দেখা হয়নিকো কোনদিনছোট্ট প্যাকেটে এখনও অমলিন সেই ছবিস্যুটকেসে রাখা আছে শুধু। আমি তো কুয়াশা মাখিনি কোনদিন তাহলে এমন আবছা হয়ে উঠছে কেন চারিপাশ!

কাল শেষ বিকেলে গেছিলাম। জীর্ণ ভাঙা গেট খুলে হেঁটে হেঁটে সারাটাপথ। বোগেনভেলিয়ারা মাথা নাড়িয়েছিল শুধু। আর পথে পড়েছিল ঝরে পড়া পাতার রাশি। আজ ধূপ আনিনি। ফুল তো গাছেরাই দেয়। রোজ রোজ সাজিয়ে তুলতে আর ভাল লাগেনা। ভেজা ভেজা হাওয়া দিচ্ছিল খুব। তাই গায়ের কোট খুলে ঢেকে দিয়েছিলাম তোমাকে। শুধু তুমি ঘুমোচ্ছিলে বলে, চুপ করে অনেকক্ষণ তোমার কাছে বসেছিলাম।

১০
সাদাকালো বাতিঘরে লণ্ঠন জ্বলেনি আজ কতকাল। ভগ্ন ধ্বংসস্তুপে জাহাজ আসেনি সারারাতে। শুধু রঙচঙে ভেলা ভেসে বেড়িয়েছে এদিক ওদিক। জলতলে করতল রেখে তুমি মেঘ হয়েছ আকাশের বুকে। আমার একাকী বালিয়াড়ি জুড়ে লাল কাঁকড়ারা হেঁটে গেছে কাল মাঝরাতে। স্মৃতিজুড়ে নিষিদ্ধ কাশির সাথে চাপ চাপ রক্ত। সেই রক্তে আঙুল ডুবিয়ে লোহিতকণা খুঁজেছি আমি।

১১
আমার দিনান্তে ঈশ্বর ছিল। আর ছিলে তুমি। তোমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছি আজ একান্তেতারপর থেকে সময় কাঁটা মেপে চলেনা এলোমেলো পায়ের ছাপ ম্যান্ডোলিনের সুরে মাতাল হয়। আমার ফুরিয়ে যাওয়া মদের বোতলে আর একবিন্দু জলকণা অবশিষ্ট নেই। বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে কবে ঈশ্বরকেও খুঁজিনি আজ বহুকাল হয়ে গেল। ঈশ্বর আর তোমাকে একসাথে হারিয়েছি আমি

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
প্রকাশিত: আঁতুড়ঘর - দ্বিতীয় বর্ষ, বইমেলা সংখ্যা, পৌষ ১৪২৩, ডিসেম্বর ২০১৬.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন