কয়েকটি কাজ দ্রুত
সারা হয়। স্টোভ বের করে কেরোসিন তেল ঢালা। চা বানানো। কাপগুলো এগিয়ে আসে একে একে।
প্যান্ট-শার্ট পাল্টে শর্টস ও টি-শার্ট। রুকস্যাকেরা পিঠে ওঠে। ঝুরো বালি ভেঙ্গে
তটে নামা হয়। আপাততঃ বুড়িবালাম নদীতীর। বলরামগুড়ি মৎসবন্দর। হাঁটতে হাঁটতে টের পাই
সমুদ্র আসছে।
গতকাল তিরুপতি
এক্সপ্রেসে বাথরুমের পাশে ঝাঁঝাঁলো গন্ধে রাত কাটে। কেউ কেউ ওপরের বার্থে ভিড়চাপে
অষ্টবক্র মুনি। হাওড়ার রাত বালেশ্বরে ভোর হয়। ঘন্টাখানেকের জিপে-অটোরিক্সায় মসৃন
পথ – চাঁদিপুর সমুদ্রসৈকত। যাব দীঘা। সমুদ্রতীর ধরে হেঁটে হেঁটে।
বলরামগুড়ি এলাম।
মিনিট পঁয়তাল্লিশ লাগলো। মাছধরা ট্রলার। ক্যারিয়ারে মাছের ঝুড়িবাঁধা সাইকেল। পোড়া
ডিজেলের গন্ধ। মাছের ঝুপড়ি। ভাত খাওয়ার হোটেল। জমজমাট মৎসবন্দর। মোহনা।
নদী পেরোতে হবে। নৌকো
পারে লেগেছে। হাটুঁজল ভেঙে মালপত্র তোলা হয়। নৌকোর কত্তা খোশমেজাজে বিড়ি টানে –
‘এ্যাই ছোঁড়া, দাঁড় টান’। মাঝনদীতে ঢেউ এসে নৌকোর খোলে ঘা মারে। আমরা নিরালম্ব হই।
রুকস্যাক থেকে খাবার
বেরোয়। পাঁউরুটি, কলা...। উল্টে থাকা নৌকোর আড়ালে হাওয়া বাঁচিয়ে সিগারেটে সুখটান।
সী-গাল ওড়ে খুব। ওড়ার কি কথা ছিল? নদীর এপার নিস্তব্ধ। ফিনফিনে ঢাকাই মসলিনের মতো মাছধরা
জাল পড়ে থাকে বালির ওপর। আমরা হাঁটি। দিগন্তের দিকে মুখ তুলে। অসংখ্য ঝিনুক উপুড়
হয়ে রোদস্নান করে। তাঁত চলার মতো একঘেয়ে শব্দে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে পায়ের কাছে। দিগন্তজুড়ে
নোনাহাওয়া আর পদশব্দ।
দুপুর একটা বাজে।
বুড়িবালামের পার থেকে ঘণ্টাআড়াই হাঁটা হল। কশাপল নদী দেখা যাচ্ছে। নদীর পারে
পৌঁছতে পেছনদিক থেকে ডাক ভেসে এল – ‘এই যে ভাই, কোথ্ থেকে আসছো হে’? চারজন বসে
তাস খেলছে। সঙ্গের গ্লাসে তরল। একজন উঠে আসে। জড়ানো গলায় – ‘চশমাটা দেবে ভাই, সমুদ্র
দেখবো’। হেসে
পিছু ফিরি। দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে আমাদের। চিঁড়ে, ছাতু, গুঁড়োদুধ।
মদ্যপায়ী চারজন খেলা ফেলে অবাক চোখে আমাদের দিকে।
কশাপল নদী পেরোচ্ছি।
কাঁধের পেশীগুলো উঠছে, নামছে। চারজন মাল্লার। একসঙ্গে। ছপ-ছপ-ছপ-ছপ। ঠিক আড়াইটেয়
নদী পেরিয়ে হাঁটা শুরু হল। বড়ো বড়ো বালির ঢিপি। এখন সমুদ্র দূরে সরে যাচ্ছে।
জোয়ার-ভাঁটা। এগনো-পেছনো। ভাঁটায় সমুদ্র চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে। একটা মৃত কাছিম
চার হাত-পা ছড়িয়ে উপুড়। ঠিক যেন দিবানিদ্রায়। পিঠে বসে কাকেদের মহাভোজ।
শেষ বিকেলে যেন একদল
সারিবদ্ধ যুদ্ধবন্দী ভেজাবালির ওপর দিয়ে হেঁটে যায়। প্রত্যেকের অন্তরে বেয়নেট
ওঁচানো সৈনিক জেগে থাকে। সমুদ্র থেকে মেঘেরা ভেসে আসে। নির্জন বেলাভূমি। চোখের
পাতায় কালকের রাতজাগা ঘুম নেমে আসে। দূরে হাসকরা নদী। পার হলে গ্রাম। রাতের আশ্রয়।
সন্ধ্যার বেলাভূমিতে
একচক্ষু নির্জনতা। যূথবদ্ধ ঢেউরা মাতাল পায়ে এলোমেলো। গ্রামের একটা বাড়িতে ভাজা
হচ্ছে মাছেদের দলবলকে। সমুদ্রতট শেষে উঁচুতে ছোট্ট পাতাছাওয়া কুটীর। চারিদিক খোলা।
তাতেই হাত-পা ছড়িয়ে ক্লান্ত পদযাত্রীরা। পাশেই স্টোভে ভাত ফোটে। টগবগ কোরে। ভাতের
গন্ধে জড়ো হয় আকাশ-তারার দল। স্বাতী, অরুন্ধতি, রোহিনীরা।
আমাদের জীবনের সমস্ত
ঋজুতা নুয়ে পড়ে কংক্রিটের জঙ্গলে। সময় চুরি কোরে তিনটে বাইশের কল্যাণী লোকাল।
হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে যায় মূল্যবোধ। তাই নুন-শোয়ে দক্ষিণী চলচ্চিত্র। তাই
উৎকোচতন্ত্র। তাই শহুরে জীবনযাপন।
এখানে কী ভীষণ টানটান
অন্ধকার। কালো অথচ সতেজ। প্রত্যেকটা গন্ধকে আলাদাভাবে চিনে নেওয়া যাচ্ছে। এই Classification-ই তো চাই। সময়ের চাকাকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে প্যালিওজোইক অধিকল্প
পেরিয়ে...... আবার একটা Big Bang হতে পারে না?
সকাল হয়। দমকা
বাতাসের মতো গ্রামের মানুষেরা মাঝে মাঝে আসেন সমুদ্রতীরে এই পর্ণকুটীরে। আমরাও
গ্রাম দেখতে যাই। কোনরকমে টিঁকে থাকার এক চালচিত্র। দারুন লম্বা এক মানুষকে দেখি।
ইনি কি গিনেস রেকর্ডসের নাম শুনেছেন? কাল রাতে যিনি মাছ রান্না করে দিলেন, তাঁকে
টাকা দিতে গেলে দুহাত ধরে ফেলেন। দুচোখে নিঃশব্দ বার্তা – ‘আপনারা অতিথি, এভাবে
অপমান করবেননা’। এইসব
মানুষের মতো প্রায় অবলুপ্ত প্রাণীদের কি দিতে পারি, খাঁচা?
আবার সমুদ্র, আবার
তীর ধরে হেঁটে যাওয়া। আবার দিগন্তজোড়া নোনাগন্ধ। আবার ঝিনুকের স্তূপ। আবার পাখিদের
ঝাঁক বেঁধে ঢেউ-এর মাথায় লাফিয়ে চলা।
সোজা, যতদূর চোখ যায়,
নিঃসঙ্গ বেলাভূমি। হয়ত কোনকালে ঋজু ছিল। সটান। মেরুদন্ড সোজা করে। এখন বিশ্রামকাল।
আমরা হেঁটে যাই উল্টোনো নৌকোর পাশ কাটিয়ে।
হঠাৎ দূরে ভিড় দেখি।
কোলাহল বড় দ্রুত বাজে। নিশান ওড়ে। লাল নীল সাদা। মাছ কেনাবেচা চলে। পাইকারী।
রুকস্যাক নামিয়ে রেখে হাঁফিয়ে নিই। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমরাও মেছো হয়ে যাই।
আমাদের পরণে ট্যানা। গায়ে মাছের আঁশটে গন্ধ। মাথায় তেকোনা টুপি। হইহই কোরে নৌকো
নামাই সমুদ্রে। ঢেউ-এর সাথে দামালপনা কোরতে কোরতে এই পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্যকোথাও,
অন্য কোনখানে।
খিদে পায়। বাঁদিকের
ঝাউবনের ছায়ায় আশ্রয় নিই। সেই ছাতু, সেই চিঁড়ে, সেই গুঁড়ো দুধ। ঘুম পায়। সুনিবিড়
ঘুম। একটা পাখি ডাকে। হলুদ-নীল গায়ের রঙ। এ পাখি কি আগে দেখেছি কোথাও? এই নিবিড়তা,
এই শান্তি?
সকাল থেকে আজ
ঘণ্টাপাঁচেক হাঁটা হোল। সুবর্ণরেখার মোহনার কাছে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বড়ো
বালি তোলা নৌকোয় মোটর লাগানো। ভট্-ভট্ শব্দ কোরে যেখানে নিয়ে যায়, সেখানে জল
কোমরের কাছে। জল ভেঙে তটে উঠি। কোথায় শক্ত জমি? এতো একহাঁটু কাদা! কাদা পেরোতে সময়
লাগে ষাট মিনিট প্রায়। গ্রামে পৌঁছোই। গ্রামের নাম চন্দ্রাবালিঘাঁটি। আকাশের ঘড়িতে
এখন সন্ধ্যে।
একটা পরিত্যক্ত মাছের
ঝুপড়ি। পাতার ছাউনি সরে সরে ফাঁকফোকর। সেই ফাঁকফোঁকরে আকাশের টুকরো। বিছানা পাতি
সবাই। এ পৃথিবীতে এখনো বিছানা পাতার মতো অঢেল জায়গা। তবুও গাইডেড মিসাইল। তবুও
জীবানু বোমা। তবুও কূটনৈতিক চক্রান্ত।
এই ট্রেক। এই বালি
ভেঙে হেঁটে যাওয়া। এই দৃষ্টিজোড়া কেয়াঝোপ। এই উদোম রোদ্দুর। এই হিমেল রাত। এই আকাশ-তারাদের
খুনসুটি। চেতনাজুড়ে এইসবের কোলাজ।
একটা দশমুন্ডঅলা রাবণ
আছে। রাবণ তো দশ মাথারই হয়। আমাদের ঝুপড়ির পেছনে। আকারে বিশাল। সকালে বাইরে বেরিয়ে
দেখি নৌকো বানানো হচ্ছে। সপ্তডিঙ্গা মধুকর নাকি মনপবনের নাও?
এখন সমুদ্র নেই।
নির্জন বেলাভূমি নেই। গ্রামের মধ্যেকার লাল ধূলোওঠা পথ। এ পথে আজ তালসারি হয়ে দীঘা
যাব।
তালসারির একটু আগে
সমুদ্র তীরে এসে পৌঁছলাম। আসলে একটা খাঁড়ি। মূল সমুদ্র থেকে অনেকটা ঢুকে এসেছে।
অনেক নৌকো, অনেক মাছ অনেক মানুষ। তালসারিতে। ভিড় ছাড়িয়ে হেঁটে হেঁটে নির্জনতায়।
সকাল থেকে হেলেদুলে ঘণ্টাচারেক হাঁটা হলো। আর বড়জোর একঘন্টা। নিউদীঘা পৌঁছে যাব।
তারপর ভিড়, কোলাহল, শহুরে অসভ্যতার মাঝে ঢুকে পড়া। এভাবেই চক্রাকারে ফিরে আসা।।
--------------------------------------------------
(কাঁচরাপাড়া-র
‘কোয়েস্ট’ তার দলবল নিয়ে ১৯৯৩-এর জানুয়ারীতে এ পথে হেঁটে এসেছিলো। পদযাত্রীদের
রুকস্যাকেই ছিলো চাল-ডাল, আলু-পেঁয়াজ, স্টোভ-কেরোসিন, ডেকচি-হাতা। এই লেখায় সেই
হেঁটে যাওয়ার বিবরণ দেওয়ার অক্ষম চেষ্টা করেছি মাত্র। এ পথে অনেকে গেছেন। যাঁরা
যাননি, তাঁদের জানাই, এই হাঁটাপথে শহুরে গিরগিটি আর কাঠঠোকরার দেখা পাবেননা।
গ্যারান্টি।)
প্রকাশিত : এপার ওপার ইছামতি, বৈশাখ সংখ্যা, ১৪২৪ (২০১৭)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন