কুমায়ুনের চাঁদ
রাজবংশে এক কন্যা জন্মগ্রহণ করল। কূলপুরোহিত তার ঠিকুজি তৈরী করে রাজার কাছে
গেলেন। বললেন, এই কন্যা অতি সুলক্ষণা, দেবীর অংশে জন্মগ্রহণ এই কন্যার। যথারীতি
রাণীমাও শুনলেন সেই কথা। কন্যার নাম রাখা হল, নন্দা।
তারপর যা হয়, কালে কালে সকলেই ভুলে গেলেন সেই কথা। নন্দা একদিন বিবাহযোগ্যা হল। রাণীমা রাজাকে বললেন, মেয়ে বড় হয়েছে, এবার ভালোবংশে তাকে পাত্রস্থ করতে হবে তো। রাজামশাই গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন। এই কথাটা কি করে যেন নন্দার কানে গিয়ে পৌঁছল। নন্দা মায়ের কাছে এসে বলল, মা শুনলাম তোমরা আমার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছ? রাণীমা মেয়ের হাত ধরে কাছে নিয়ে বসালেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, মন খারাপ করছে? কিন্তু মা, মেয়ে হয়ে জন্মেছ যখন বিয়ে করে একদিন তো শ্বশুরবাড়ি যেতেই হবে। বিয়ে হোক, কদিন পর দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। নন্দা মুখ নিচু করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর খুব আস্তে আস্তে বলল, মা আমার জন্য পাত্র খুঁজো না। আমি বিয়ে করব না। মা বললেন, একি কথা। এরকম কথা বলে না মা। বড় হয়েছ মা, তোমাকে ভাল বংশে পাত্রস্থ না করে আমরা নিশ্চিন্ত হই কি করে। কিন্তু বিয়ের কথায় নন্দা বসল বেঁকে।
তারপর যা হয়, কালে কালে সকলেই ভুলে গেলেন সেই কথা। নন্দা একদিন বিবাহযোগ্যা হল। রাণীমা রাজাকে বললেন, মেয়ে বড় হয়েছে, এবার ভালোবংশে তাকে পাত্রস্থ করতে হবে তো। রাজামশাই গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন। এই কথাটা কি করে যেন নন্দার কানে গিয়ে পৌঁছল। নন্দা মায়ের কাছে এসে বলল, মা শুনলাম তোমরা আমার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছ? রাণীমা মেয়ের হাত ধরে কাছে নিয়ে বসালেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, মন খারাপ করছে? কিন্তু মা, মেয়ে হয়ে জন্মেছ যখন বিয়ে করে একদিন তো শ্বশুরবাড়ি যেতেই হবে। বিয়ে হোক, কদিন পর দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। নন্দা মুখ নিচু করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর খুব আস্তে আস্তে বলল, মা আমার জন্য পাত্র খুঁজো না। আমি বিয়ে করব না। মা বললেন, একি কথা। এরকম কথা বলে না মা। বড় হয়েছ মা, তোমাকে ভাল বংশে পাত্রস্থ না করে আমরা নিশ্চিন্ত হই কি করে। কিন্তু বিয়ের কথায় নন্দা বসল বেঁকে।
অবশেষে জানা গেল,
নন্দার নাকি পাত্র ঠিক করা হয়ে গেছে, তাই এত আপত্তি। কে, কে সেই পাত্র? নন্দা মুখ
নিচু করে বলল, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং ভোলানাথ, শিব। তাঁকে ছাড়া সে আর কাউকে বিয়ে
করবে না। আর তাই সে নিজেই কৈলাশে যাবে। যাবেই।
কি? মেয়ে আমার
উন্মাদ হয়ে গেল নাকি? রাণীমা সটান রাজার সমীপে। রাজা শুনে উদ্ভ্রান্ত। কি করা যায়।
কূলপুরোহিত এলেন। গম্ভীর মুখে বললেন, মহারাজ আমি তো এই কন্যার কোষ্ঠী বিচার করে
সেই কবেই বলেছিলাম, দেবীর অংশে জন্মগ্রহণ এই কন্যার। অনেক ভাবনাচিন্তা,
কান্নাকাটির পর ঠিক হল নন্দা যখন যাবেই, তাহলে লোকলস্কর, সখী-সাথীদের নিয়েই সে
যাক। যতই হোক, সে রাজকুমারী তো বটে। একা একা তো আর যাওয়া চলে না।
অবশেষে, কৈলাশ
যাওয়ার পথে একদিন নন্দা এসে পৌঁছল ওয়ান গ্রামে। সেখানে দুদিন বিশ্রাম করে,
ক্লান্তি কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু হোক – এই প্রস্তাব সকলের। কি আর করা। নন্দা রাজি
হল। কান্ড ঘটল তারপর। সঙ্গী লাটু কারনবারি পান করে এমন ‘হুল্লোড় মচাল’ যে নন্দা
রেগে আগুন। পরদিন নন্দা লাটুকে ডেকে পাঠাল। আর সটান বলে দিল, তুমি আমাদের সঙ্গে আর
যাবেনা। লাটুর তখন নেশা কেটে গেছে। ফলে সে শুরু করল কান্নাকাটি। হাতপায়ে ধরা।
কিন্তু নন্দার এক কথা, লাটু যাবে না তো যাবেই না। সকল উপায় যখন ব্যর্থ হল, তখন
লাটু বলল, ঠিক আছে, আমি আর যাব না, আমি এই গ্রামেই থেকে যাব। কিন্তু দিদি,
ভবিষ্যতে যদি কেউ এই পথে যায়, তবে তাকে আগে আমার পূজো করে, এই পথে যেতে হবে।
তথাস্তু।
সেই থেকে নিয়ম
হয়ে গেল, লাটু মহারাজের পূজো করে, তাঁকে তুষ্ট করে এই পথে যেতে হবে। ওয়ান গ্রাম থেকে বেশ
উঁচুতে তৈরি হল লাটু মহারাজের মন্দির।
-২-
১৭/১০/১৯৯৫ -
লাটকুবড়ির
(লাটকোপরি) ভয়ানক জঙ্গল থেকে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন শুধু মনে হচ্ছিল, জঙ্গল কি সত্যি
সত্যি শেষ হল? আস্তে আস্তে ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে, ঘনশ্যামকে বললাম, একটা হল্ট নাও।
ঘনশ্যাম পিছু ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ল – থক্ গয়ে দাদা। মাথা নেড়ে না বলে, পিঠ থেকে
রুকস্যাকটা নামালাম। বসে পড়ে স্যাকের পকেট থেকে জলের বোতল বার করে দু’ঢোঁক খেয়ে
কিরকম আনমনা হয়ে গেলাম। ঘনশ্যাম কাছে এল – দাদা, জলদি জলদি যানা চাহিয়ে। ততক্ষনে
এক এক করে সবাই আসতে শুরু করেছে। আমাকে আর ঘনশ্যামকে বসে থাকতে দেখে ওরাও পিঠ থেকে
যে যার স্যাক নামাতে লাগল। ঘনশ্যামকে একটা সিগারেট দিয়ে নিজে একটা ধরালাম। দু’টান
দিয়ে সজোরে ধোঁয়া ছেড়ে মনে হল, অভিজ্ঞতা বটে একটা। সুন্দরডুঙ্গার পথে ঢুনিয়াঢনের
জঙ্গলও মারাত্বক, কিন্তু এমন পাগলপারা জঙ্গল সে ছিলনা।
ঘনশ্যামকে বললাম,
আর কি চল, ওঠা যাক, ভুজানি তো পৌঁছতে হবে। একে একে সবাই মিলে উঠে ভুজানির
উদ্দেশ্যে হাঁটা লাগালাম। ভুজানি-র আগে একটা চওড়া নালার খাত। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে
এসেছে। এখন শুকনো। তার এপার থেকে নেমে ওপারে উঠতে উঠতেই সময় শেষ। ঠিক ছিল তিনটের
মধ্যে ভুজানি পৌঁছব। কিন্তু, এখনই তিনটে বাজে।
আকাশ অনেকক্ষণ
থেকেই থমকে ছিল। ভুজানিতে পৌঁছে যখন টেন্ট পিচ করছি, আকাশ থেকে পড়া শুরু হয়ে গেল, হোমিওপ্যাথি
ওষুধের ছোট গুলির সাইজে। তাড়াতাড়ি টেন্ট পিচ করে মালপত্র ঢোকান হল। সবাই এখনও এসে পৌঁছয়নি। পোর্টার
দু’জন একটা বড় বোল্ডার পেয়ে তার সঙ্গে কিচেনের নীল প্লাস্টিকটা বাঁধাবাঁধির চেষ্টা
শুরু করল। আস্তে আস্তে সবাই যখন এসে পৌঁছল, ওষুধের গুলির সাইজ তখন বেশ বড়। কিচেনের
প্লাস্টিকের তলায় স্টোভটা জ্বেলে তার ওপর একটা ডেকচি বসালো সঞ্জয়। তারপর, চিঁড়ের প্যাকেটটা
নিয়ে এসে প্রায় পুরোটাই ঢেলে দিল। সকাল সাতটার নুডলস আর দুপুর বারটার চা-বিস্কুট
তখন পেটের কোনায়। একটা খুন্তি নিয়ে সঞ্জয় বসল কাঁচা চিঁড়ে গরম করতে। আমি পাশে বসে সবে মৌজ
করে একটা সিগারেট ধরিয়েছি, মাথার ওপরকার নীল প্লাস্টিকটা গেল উড়ে। তাড়াতাড়ি উঠলাম
ধরতে। অবশেষে, ধরে নিয়ে এসে টাঙাতে গিয়ে বুঝলাম, এ আমার কম্ম নয়।
- রেখে দে। এর
মধ্যেই ভেজে নেব।
আমি ওর পাশে বসলাম।
– Snow দিয়ে চিঁড়ে মাখা এই প্রথমবার খাব।
সঞ্জয় হাসল শুধু।
- কি বস্, গম্ভীর লাগছে কেন? আমি ওকে রাগাতে
ওর মুখের ওপরই ধোঁয়া ছাড়লাম। (ও বেচারা Non-smoker)।
- টের পাবি কাল
থেকে।
- কি?
- ভুগতে হবে। এখন
আমায় কিছু বলে লাভ নেই।
- এখন তোকে কিছু
বলে লাভ নেই, সে নয় বুঝলাম। কিন্তু ভুগতে হবে কেন?
- ন্যাকামি করিস
না, বাবুন। আমি প্রথম দিন থেকেই বলে আসছি নতুনদের নিয়ে এই পথে আসা ঠিক নয়।
- আরে কিচ্ছু হবে
না। আমরা তিনজন তো আছি।
- তোর এই
গোঁয়ার্তুমি ছাড়তো। কালকে দেখবি কি অবস্থা হয়। আমি ঘনশ্যামের সাথে কথা বলছিলাম। ও বলল, দাদা কালসে বহুোত
মুশকিল হোগা।
- ধুর, ছাড়ত। ও
ব্যাটা প্রথম থেকেই আসতে চাইছিলনা। বলে, ‘সিজন খতম হো গ্যয়া দাদা’, আরে আমরা কি
ট্যুরিস্ট পার্টি নাকি, যে সিজন দেখে, হোটেল বুক করে আসব? ছাড় তো ওসব। প্রদীপ আর
আশিষ ঠিক টেনে দেবে। বাবুদা আর সঞ্জীবকে অবশ্য একটু
হেল্প করতে হবে।
সঞ্জয় কথা বলে
কম। আমার জ্ঞান শুনে আরও চেপে গেল।
চিঁড়ের ডেকচির
মধ্যে যে পরিমাণে তুষার পড়তে লাগল, তাতে বাধ্য হয়ে সেঁকার এখানেই ইতি। ডেকচি নিয়ে ফোর-মেন টেন্টটায়
ঢুকলাম। সবাই এখন ওটাতেই বসে আছে। চানাচুর, বাদাম, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা মেখে, আঃ। সঞ্জয়
একটা গামলায় মাখা চিঁড়ে নিয়ে ঘনশ্যামদের টেন্টে দিয়ে এল।
-৩-
- নন্দা। কি দেখছিস?
পিছন থেকে হালকা
গলার ডাক শুনেও নন্দা পিছন ফিরল না। ও জানে এটা লছমীর গলা। সে চুপ করে কুন্ডের
দিকে তাকিয়ে যেমন বসেছিল, বসেই রইল। লছমী এসে ওর পাশে বসেই ওকে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে
ধরল। একমাত্র লছমীর সঙ্গেই ওর মনের সম্পর্ক, সেই ছোটবেলা থেকেই। ঘরে পালঙ্কে আধশোয়া
হয়ে কতইনা গল্প হত দুজনের ফিসফিস করে।
নন্দাকে দুহাতে
জড়িয়ে থেকেই লছমী কুন্ডের দিকে তাকাল,
- কি সুন্দর না?
- হুঁ।
- জলে দেখ, একটাও
পাতা পড়ে নেই।
- এখানে গাছ
কোথায়, যে পাতা পড়বে।
- হুঁ, তাওতো
বটে। আসলে তোকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে আমার এমনিই মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
- আমাকে নিয়ে
আবার চিন্তা কিসের?
- তুই কি বুঝবি।
এই যে তোর সঙ্গে হেঁটেই যাচ্ছি, হেঁটেই যাচ্ছি, কোথায় যে যাবি না পারছি বুঝতে,
কোথায় যে থামবি তাও তো বুঝতে পারছি না।
- কেন, জায়গাটা
কি খারাপ?
- খারাপ মানে! এত্ত
সুন্দর জায়গা এই বেদিনি বুগিয়াল, আর ছোট্ট কুণ্ডটা মন ভরিয়ে দেয়। এই জায়াগায় মন
চায় দু-চার দিন শুয়ে বসে কাটাতে।
- কিন্তু লছমী
এবার যে উঠতে হবে। ওদের বল, এবার যাত্রা শুরুর তোড়জোড় করুক।
-৪-
১৮/১০/১৯৯৫ -
- কাল রাতে খিচুড়িটা যা বানিয়েছিলি
না, ফাটাফাটি। ওর সঙ্গে slight গাওয়া ঘি পড়ত, আর একটা অমলেট, আহ্। পানুর কাঁধে চাপড় মেরে বললাম। আমার বাংলায় বলা কথা কিছুই না
বুঝে পানু তার ছোপধরা হলদে দাঁত বের করে হাসল। পানু্ সিং হল আমাদের মালবাহক কাম
রাঁধুনি। বয়স ১৮-২০ হবে। ওর সঙ্গে আরও একজন আছে,
একটু বয়স্ক, ৩৫-৪০ হবে, তার নাম সুন্দর সিং, সে মালবাহক কাম রাঁধুনির হেল্পার। আর
সবার ওপরে আমাদের গাইড ঘনশ্যাম। ঘনশ্যাম সিং বিস্ত্। ২৫-২৬ হবে। এই তিনের সঙ্গে আমাদের সাত। সবে মিলে দশ।
মালপত্র গোছানো হচ্ছে। টেন্টের আউটার,
ইনার পরিষ্কার করে প্যাক করা হচ্ছে। পেগগুলো, পোলগুলো গুনে গুনে রাখা হচ্ছে। প্রায়
সাড়ে আটটা, এবার বেরোতে হবে। ভুজানি এমন একটা জায়গা, যেখানে রোদ ঢোকে দেরিতে।
জায়গাটা, স্যাঁতস্যাঁতে, বিচ্ছিরি, চারদিকে পাহাড় ঘেরা। একটা পাহাড়ের ঢালে ৫০০-৬০০ স্কোয়্যার ফুটের মতো জায়গা। নেহাত রাস্তায় রাত
কাটানোর এটাই জায়গা, তাই থাকা। জায়গাটা ধুপিগাছে ভর্তি। ধুপিগাছ হল জুনিপার, ঝোপ
জাতীয়। ৮ থেকে ১০-১১ হাজার ফুটের মধ্যে পাওয়া যায়। জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। আমাদের বাঁদিকে নন্দাকিনি নদী, নিচুতে। আমরা তার ধারে ধারে এগিয়ে যাব আজ, সরু পথ
ধরে পাহাড়ের পেট দিয়ে দিয়ে।
মালপত্র গোছানো হয়ে গেলে সবাই এবার
রেডি, ব্রেকফাস্টের জন্য। পানু কি তৈরি করেছে, না পাওয়া পর্যন্ত জানা যাচ্ছেনা।
সঞ্জীব (এবারেই ওর প্রথম পাহাড়ে আসা) পটাং করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলল। প্রতিবর্তক্রিয়ায়
আমি সঞ্জয়ের দিকে তাকালাম। দেখি,
সঞ্জয় চোখের কোণ দিয়ে ওকে মাপছে। বুঝলাম সঞ্জয়ের পারদ চড়ছে।
পানু একটা থালা নিয়ে হাজির।
- ‘লে লো সাব’।
- ‘দে দো বাবা’।
প্রত্যেককে একটা করে রুটি ধরিয়ে দিয়ে
চলে গেল।
- ও বাবা পানু, খাব কি দিয়ে?
পানু দৌড়ে এসে সবাইএর সামনে আচারের
শিশিটা নামিয়ে রাখল। কেউকেউ আচার নিল। আমি তাকালাম শিশিটার
দিকে। এই সকালে ঐ তেলতেলে আচার দিয়ে আধসেঁকা রুটি খেলে আর দেখতে হবেনা। সারাদিন
খেতে টেতে হবেনা, বুকভরা ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে অম্বল। অবশ্য, কোম্পানির রেশনের খরচ
বেঁচে যাবে। অগত্যা শুকনো রুটি চেবানো, মাঝে মাঝে বোতল খুলে হাঁ করে মুখে জলঢালা। খাওয়া শেষে ওঠা হল। স্যাক তোলা হল পিঠে। এবার যাত্রা শুরু, আজকের দিনের।
কাল বিকেলের বাকি কাহিনী -
----------------------------------------
কাল বিকেলে ফোর-মেন টেন্টের ভেতর বসে
চিঁড়েমাখা খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে তাসের প্যাকেট খুলে বসা হল। অকশন ব্রিজ। নারকোল তেলের টিন কেটে বানানো তিনটে মোমদানিতে জ্বালানো হল
মোমবাতি। জমিয়ে শুরু হল তাসখেলা, আর বদ্ধ টেন্টে আমার
আর ওপির active smoking ও বাকীদের passive smoking.
আধঘণ্টা মতন কেটেছে।
- ঘাড়ের ওপর টেন্ট ঝুলে পরে কেনরে?
সঞ্জীব বসেছিল টেন্টের মুখের কাছে।
- এই চেনটা খোল তো।
ও জিপার ধরে টেনে চেনটা খুলে
টেন্টটার মুখের Flapটা সরাল। আধো আলোয় আমরা হতবাক। আরিব্বাস। এত snowfall হচ্ছে।
- বেরো, বেরো শিগগির। সঞ্জয় বলে উঠল।
- কোথায় বেরবো? সঞ্জীব প্রথমে থতমত
খেয়ে তারপর বলল।
- আরে তুই সর, আমরা বাইরে বেরবো।
তাড়াতাড়ি উইন্ডচিটার পরে নিয়ে
গুঁড়িশুড়ি মেরে ওপি, সঞ্জয় আর আমি
বেরোলাম। চারিদিক সাদা হয়ে গেছে। আকাশে মিয়নো আলো। ঘড়ি দেখলাম, পৌনে
পাঁচটা। বিকেল। চোখ গেল টেন্টের দিকে। Snow পড়ে
পড়ে টেন্ট ঝুলে পড়েছে প্রায়। এবার ভাল টেন্ট আনতে পারিনি। আউটারটা ভালো নয়,
একদমই। কি আর করা যাবে। তিনজনে হাতে হাতে টেন্টের গা থেকে তুষার ঝেড়ে ফেলতে লাগলাম। পেগগুলো ভালো করে
গেঁথে দিলাম আবার। মাঝারি পাথর যে কটা পেলাম, নিয়ে এসে পেগগুলোর ওপর চাপিয়ে দিলাম।
এবার টু-মেন টেন্টটা নিয়ে পড়া গেল। সেটাও ঠিকঠাক করা হল। তারপর, ঘনশ্যামদের
টেন্টের কাছে গেলাম। ওরা নিজেরাই ভেতর থেকে হাত দিয়ে ঝেড়ে ঝেড়ে snow ফেলে দিচ্ছিল। আমাদের গলা পেয়ে ঘনশ্যাম টেন্টের মধ্যে থেকেই বলে উঠল, ‘দাদা
বোলা না, সিজন খতম হো গ্যয়া, মত্ যাও’। নিচের দিকের গ্রামে যে পোর্টাররা থাকে,
তারা আসলে snow কে বেশ ভয় পায়। তাছাড়া, তাদের পর্যাপ্ত পোশাক
ও জুতো থাকেনা। অবশ্য আমাদেরও নেই। কোনদিনও ছিলনা। তবু, এভাবেই যাওয়া হয়
প্রত্যেকবার।
তাড়াহুড়োয় উইন্ডচিটারের হুডটা
লাগাইনি কেউই, ফলে মাথা, মুখ নিমেষে ভরে যাচ্ছে। মাথা ঝাঁকিয়ে, হাত দিয়ে মুছে
হুডটা লাগিয়ে নিলাম। চশমাটা মুছছি, প্রদীপ বেরিয়ে এল টেন্ট থেকে। ও হাঁ করে দেখছে
চারিদিক। ওর ট্রেকিং-এর অভিজ্ঞতা বলতে সান্দাকফু যাওয়া। হিমালয়ের এই গহনে প্রবল
তুষারপাতের মধ্যে কি ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সেটাই অনুভব করছে। মনে হল একটু ঘাবড়েও
গেছে। সঞ্জয় আর ওপি টেন্টে
ঢুকে গেল। চারিদিক নিস্তব্ধ। একটাও আওয়াজ কোথাও নেই। শুধু নীরবে তুষারপাত হয়ে
চলেছে।
- কি গুরু হবে
নাকি? সিগারেট বার করে ওর দিকে দিলাম। ও খায়ইনা বলতে গেলে, তবু হাত বাড়িয়ে নিল।
দেশলাই জ্বালিয়ে ওরটা ধরিয়ে, নিজেরটা ধরালাম।
- হাতের আড়ালে নিয়ে
খা।
- দারুণ ব্যাপার?
হাসল। মনে জোর আনার চেষ্টা করছে।
- এই জন্যই তো
এসেছিস। তবে আর ঘণ্টাখানেক এই ফোর্সে পড়লে ওর আগে একটা ‘নি’ বসাতে হবে। যা টেন্ট
আমাদের।
সিগারেট ফেলে,
নিবিয়ে আমরাও গুঁড়ি মেরে টেন্টে ঢুকে পড়লাম।
বিকেল সওয়া
পাঁচটা। বাইরে প্রবল তুষারপাত হয়েই চলেছে। একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে টের পাচ্ছি। তাস
খেলা চালু রাখা গেলনা। টেন্টের মধ্যে আবহাওয়া ক্রমশঃ গুমোট বাঁধছে। সেটা পরিষ্কার হয়ে
গেল, যখন আমি একটা সিগারেট ধরাতে গেলাম। সঞ্জীব হঠাৎ
চিৎকার করে উঠল – ‘তুমি টেন্টের মধ্যে সিগারেট ধরাচ্ছ কেন’? আমি ওর চোখের দিকে
তাকালাম। মোমের আলোয় ওর চোখমুখের অবস্থা যা দেখলাম, তা চিন্তায় ফেলার মতো। একটা
প্রবল ভীতি ওর মধ্যে চেপে বসেছে। কিছু না বলে সিগারেটটা রেখে দিলাম।
টেন্টের মধ্যে টুকটাক
গল্পের চেষ্টা জারি রাখছি। কিন্তু হুঁ হাঁ ছাড়া সেরকম সাড়া পাচ্ছিনা। ওপি খোলা স্লিপিং ব্যাগগুলো একজায়গায় করে মুখ
গুঁজে আধশোয়া হয়ে রয়েছে। যে চারজন হিমালয়ের এত গভীরে কোনদিন আসেনি, তুষারপাত দেখেনি, তারা এই পরিমাণ
তুষারপাতে কমবেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝেই চেন খুলে বাইরেটা দেখছে। মোমবাতির আলোয় ওদের
উদ্বিগ্ন মুখ ক্রমশঃ চিন্তা বাড়াচ্ছে। ভয়ের চোটে ফিরে যাওয়ার বায়না না ধরে। সঞ্জয়
আর আমার চোখাচোখি হচ্ছে, নীরবে। এরই মধ্যে
দুজনে একবার বাইরে বেরিয়ে এসে দুটো টেন্টের আউটারই পরিষ্কার করেছি। পেগগুলো ভাল করে মাটিতে
গেঁথে দিতে হয়েছে। একটু বেশিই যেন snowfall হচ্ছে। চিন্তায় ফেলল।
সন্ধ্যে ছটা।
কিছুক্ষণ আগে তুষারপাত বন্ধ হয়ে গেছে। আমি আর সঞ্জয় বাইরে এসেছি। ওরা টেন্টেই
শুয়ে, বসে আছে। একটু relaxed. আলো সামান্য বেড়েছে, আকাশে। ভুজানি চাপা জায়গা, নাহলে আরেকটু
আলো ঢুকত। চারিদিক পুরু তুষারে সাদা হয়ে আছে। ধুপিগাছগুলো সব ঢেকে গেছে। এতটা তুষারপাত
এই সাড়ে দশ হাজারেই পেয়ে যাব, বুঝিনি।
-৫-
১১/১০/১৯৯৫
হাওড়া স্টেশনে যখন পা দিলাম, তখন
সন্ধ্যে ৬টা। নাইন আপ দুন এক্সপ্রেসে বার্থ রিসার্ভেসান আমরা পাইনি। আমাদের দলে তিনজন হল ভারতীয় রেলের
কর্মী। হাওড়া স্টেশনে টিটি অফিসে গিয়ে তারা অনেক বোঝালো যে কেন আমাদের রিসার্ভেসান
পাওয়া উচিত। ‘হামলোগ এক্সপিডিশনমে যা
রহে হ্যায়। হামারা সাথ বহুত মালপত্র হ্যায়। ট্রেন মে হামারা নিদ নাহি আয়েগা তো
এক্সপিডিশন বিগাড় যায়েগা। এক্সপিডিশন বিগাড় যানে সে ইন্ডিয়াকো বহুত লস্
হোগা......’। অসাধারণ হিন্দিতে কাহিনী শুনিয়েও গয়া ডিভিশনের টিটিদের মন গলাতে
ব্যর্থ হল। অগত্যা, জেনারেল কম্পার্টমেন্টেই যেতে হবে। যদিও এটা জেনেই আমরা বাড়ি
থেকে বেরিয়েছি। চিন্তা শুধু মালপত্র নিয়ে। যাইহোক, টিটি ফিটিং যখন হলনা, তখন কুলি
ফিটিং করতে হবে। দুজন কুলি রাজি হল ২০০ টাকার বিনিময়ে জেনারেল কম্পার্টমেন্টে একটা
ক্যুপ জোগাড়ের।
ট্রেনে ওঠা থেকেই শুরু হয়ে গেল
অভিযান। জেনারেল কম্পার্টমেন্টের দরজায় ও করিডরে প্রচন্ড ভিড়ের সঙ্গে প্রায় হাতাহাতি করে আমাদের বিপুল মালপত্র
নিয়ে নিজেদের ওঠা। উঠে দেখি, একটা কুলি নিচের দুটো সিটে পা আর ওপরের দুটো বাঙ্কে
দুটো হাত দিয়ে তার বিশাল বপু নিয়ে একটা ক্যুপ আগলে রেখেছে। ভেতরে শুধু তার দোসর অন্য
কুলি। তার কাজ হচ্ছে, আমরা ছাড়া অন্যকেউ ঢুকতে চাইলেই, ঢিসুম্। এবং চোখের সামনে সত্যি সত্যিই একজন খেয়ে গেল। আমাদের ভেতরে ঢুকতে গেলে ঢুকতে
হবে প্রথম কুলির দুপায়ের ফাঁক দিয়ে। তাই সই। দুদিকের সিটের মাঝে মেঝেতে রাখা হল
মালপত্রের ডাঁই। আমাদের সবাইকার রুকস্যাক, মালপত্রের দুটো গানিব্যাগ, টেন্টের
বান্ডিল, একটা চটের বিরাট বস্তায় বাদবাকি মালপত্র। দুদিকের সিটে সাতজন বসার পর টাকা
নিয়ে কুলি দুজন বিদায় নিল। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল ওপরের বাঙ্কে হুড়োহুড়ি করে লোক
ওঠা।
নিরুপদ্রবে বসার জায়গা এবং মালপত্র
রাখার জায়গা পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে হাতজোড় করে কপালে ঠেকিয়ে মা দুর্গাকে যখন স্মরণ
করছি, তখনই যে এমনিভাবে মাথার ওপর পুষ্পবৃষ্টি হবে কে জানে! গদগদ চিত্তে মাথায় হাত
দিয়ে দেখি ঝুরোঝুরো কি যেন! এ যে নেহাতই পারিজাতের পাপড়ির গুঁড়ো, এই ভেবে যখন মনে
খুশির ভাব, তখনই হাত নামিয়ে চোখের সামনে এনে দেখি হাতের আঙুলে কিচকিচে ধুলো। মুহূর্তমাত্র
থমকে থেকে, ঘাড় ঘুরিয়ে ওপরের দিকে চাইতেই চোখমুখের ওপর আবার পুষ্পবৃষ্টি। বেশ
কিছুক্ষণ থুঃ থুঃ ফুঃ ফুঃ করার পর যৌবনের আবেগে তেড়ে উঠতে গিয়ে দেখি, ওপরের দু’দিকের
বাঙ্কের সবাই-ই কালো কালো মুশকো মুশকো চেহারার। পরনে শুধু লুঙ্গি। কেউ কেউ তার
সঙ্গে হাতকাটা ময়লা গেঞ্জি। হাত জোড়ই থাকল এবং বিনয়ের সঙ্গে জ্ঞাত হলাম, তাঁরা
আসছেন সুন্দরবন থেকে, যাবেন নাজিবাবাদ। মজুরের কাজে। এবং তাঁদের চরণে পাদুকা নেই, বরং সঙ্গে আছে বড় বড় কোদাল, গাঁইতি ইত্যাদি।
বুঝলাম, ওপরের বাঙ্কে যাঁরা উঠেছেন, এ তাঁদেরই পদধূলি। ওপরের বাঙ্ক কাঠের এবং ফাঁক ফাঁক হওয়ায় সেই ফাঁক দিয়েই এই পদধূলির নিঃসরণ।
ট্রেন ছাড়ার পর সবাই যখন নিশ্চিন্তে,
আমরা দু-তিনজন আয়েশ করে সিগারেট ধরালাম। গলা দিয়ে কারোর কারোর কয়েক কলি গানও
বেরিয়ে আসছে। এমনি সময় আবিস্কৃত হল, আমাদের সঙ্গের খাবার জলের বোতলগুলো ফাঁকা। সুতরাং,
ব্যান্ডেল স্টেশনে জল নিতে হবে। ব্যান্ডেল ঢোকার মুখে আমি আর আশিস উঠলাম, জল নেব
বলে। আর তখনই আমার পা হড়কাল। প্রচুর মালপত্র ছিল দুই সিটের মাঝখানে তাই সামলে নিলাম, কিন্তু ব্যাপারটা কি হয়েছে
বুঝতে পা থেকে হাওয়াই চটিটা খুলে হাতে নিয়ে দেখি, চটির তলা দিয়ে তেল গড়াচ্ছে।
সঞ্জয়ের চোখের সামনে চটিটা ধরে দেখালাম। নির্ঘাৎ, গানিব্যাগের
মধ্যে রাখা সরষের তেলের প্যাকেট এই মালপত্রের চাপে ফেটেছে, এবার সামলাও।
১২/১০/১৯৯৫
পাঁজি দেখে যে বেরোয়নি, এটা জানা
ছিল। জানা ছিলনা, পাঁজিতে লেখা ছিল কিনা, ‘যাত্রা নাস্তি’। রাতদুপুরে ঘুম ভাঙতে (বসে বসে এর ওর গায়ে হেলে পড়ে যতটা
ঘুমনো যায় আর কি) দেখি ট্রেনবাবাজি কোনো এক স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন। আছেন তো আছেনই। আরে বাজল কটা? দেখি রাত তিনটে কুড়ি। সকাল ছটায়তো গয়া পৌঁছনোর
কথা। এলই বা কোথায়? জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে, ‘ও দাদা, এটা কোন স্টেশন’ বলে গলা
ফাটিয়েও কোন লাভ হলনা। কেননা, উত্তর দেওয়ার মতো ধারে কাছে কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর
মাইকে অ্যানাউন্স হল, গ্র্যাণ্ড কর্ডে মালগাড়ি ডিরেল্ড হওয়ায়, দুন এক্সপ্রেস মেন
লাইন দিয়ে যাবে। আর তখনই একজন জানলার পাশ দিয়ে যাওয়ায় জানা গেল, এটা আসানসোল
স্টেশন। অ্যাঁ, বলে কি! সবে আসানসোল, আমাদের বুকে ফুল হাফসোল।
বাদবাকি ট্রেনযাত্রা কিরূপ মসৃণ ও
পরম সুখকর হয়েছিল, তার বিস্তৃত বিবরণ পাঠককে দুঃখ দিতে পারে বলে, সংক্ষেপে জানাই, অসময়ে
স্টেশনগুলো পেরোনোর ফলে কোন স্টেশানেই খাবার দাবার প্রায় কিছুই পাওয়া যায়নি, সঙ্গে
থাকা শুকনো খাবার দিয়ে কোনরকমে পেটের কোণ ভরাতে হয়েছে। আর সকাল দশটার বেনারস
সন্ধ্যে ছটায়, সন্ধ্যে সাতটার লক্ষ্ণৌ পরদিন সকাল ছটায়, এইভাবে ১৪ তারিখ সকাল ছটার
হরিদ্বারে বিকেল চারটেয় পৌঁছুলাম, পাক্কা দশঘন্টা লেটে।
১৩/১০/১৯৯৫
হরিদ্বারে পৌঁছে প্রথমেই স্টেশনের
উল্টোদিকের একটা ধর্মশালায় ঘর পাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। দুটো ঘর পেয়ে হাফ-নিশ্চিন্ত
হয়ে এইবার GMOU (গাঢ়োয়াল মোটর্স ওনার্স ইউনিয়ন)–এর অফিসে
দৌড়লাম। কাছেই অফিস। সেখানে বদরীনাথ যাওয়ার পরেরদিনের প্রথম বাসের টিকিট পেয়ে
ফুল-নিশ্চিন্ত হলাম।
হর-কি-পৌড়ি পৌঁছে অবাক। ক্যানেলে জল
নেই। ক্যানেল পরিষ্কার হচ্ছে, দিওয়ালী উপলক্ষে। তাই ভীমগোড়ার ব্যারেজে জল আটকে দিয়েছে। তা বলে তো হরিদ্বারের প্রধান জায়গা,
হর-কি-পৌড়ি থেমে নেই। সে যথারীতি চলমান। আর চলমান হর-কি-পৌড়ি নিজেই এক মহান দ্রষ্টব্য।
এদিক ওদিক ঘুরেফিরে, উইন্ডো শপিঙে মন দিলাম। ট্রেনের খাওয়া দাওয়ায় রেশন যতটা খরচ
হয়েছে, তা পূরণ করতে শুকনো খাবার কেনাকাটাও সারা হল। এবার রাতের খাওয়া সারতে হবে।
দুদিনের অভূক্ত আমরা যখন রাত নটায়
দাদা-বৌদির হোটেল থেকে মৌরি চিবোতে চিবোতে হেলেদুলে বেরুলাম, তখন পিছনে না তাকিয়েও
বুঝলাম, আমরা যাতে খদ্দের হয়ে এই পেটচুক্তির হোটেলে জীবনে আর না ঢুকি তার জন্য দাদা
এবং বৌদি দুহাত জোড় করে ভগবানের কাছে আকুল প্রার্থনা করছেন।
রাত আড়াইটেয় উঠতে হবে। কেননা, ভোর
চারটের প্রথম বাসে টিকিট। তাই সাড়ে তিনটেয় ঘর ছেড়ে
বেরোতে হবে। নিয়মনিষ্ঠ সঞ্জয়ের হুকুমে রাত দশটায় শুয়ে তো পড়া হল, কিন্তু কারও চোখেই
ঘুম নেই। আর যে পরিমাণ খাওয়া হয়েছে, তাতে ঘুম না আসাই স্বাভাবিক। তার সঙ্গে নিশ্চই
দাদাবৌদির আড়ালে যৌথ গালাগালিও ঘুমের বারটা বাজাচ্ছে। সুতরাং কি আর করা, এ ওকে, সে
তাকে চাপড়ে চাপড়ে ঘুম পাড়াতে লাগলাম।
-৬-
১৪/১০/১৯৯৫
রাত সাড়ে তিনটেয় হরিদ্বারের ধর্মশালার
কেয়ারটেকারকে কম্বলের মধ্যে থেকে চ্যাংদোলা করে উঠিয়ে দুগ্গা, দুগ্গা বলে যাত্রা
শুরু হল। আর শুরুতেই খেল্। পিঠে বাঁধা স্যাকের ওপরে
আড়াআড়িভাবে আটকানো ম্যাট্রেস-টার একটা দিক আটকে গেল আধখোলা কোলাপসিবল গেটে। একপাক
ঘুরে গিয়ে সামনের উঠোনে মুখ থুবড়ে পরলাম। চশমাটা কি করে বাঁচল, কে জানে। একি একি
করে তিন-চারটে হাত এগিয়ে এল। উঠে পরে ধুলো টুলো ঝেড়ে, সবাইকার দিকে তাকিয়ে মুচকি
হাসলাম, কিস্যু হয়নি, ওই আর কি! যা হয়েছে, সেটা অবশ্য পরে টের পেয়েছি।
তাড়াহুড়ো করে
বাসের ছাদে মালপত্র বাঁধাছাঁদা হয়ে গেলে সবে গরম চায়ের গেলাস হাতে নিয়েছি,
ডানহাতের তালুটা যেন জ্বলে গেল। বাঁ হাতে গ্লাসটা নিয়ে দোকানের বাল্বের আলোয়
দেখলাম, ডানহাতের তালুটা বেশ জখম হয়েছে। পড়ে যাওয়ার সময় ওখানেই ভর দিয়েছিলাম কিনা!
অতঃপর, দিনের প্রথম চা আর সিগারেট পান করে সোজা বাসে। First Aid এর বাক্সটা বার করে পরিচর্যা করতে করতেই বাস ছাড়ল। আর
যাত্রীদের মধ্যে থেকে ‘জয় বদরীবিশালজী কি, জ-য়-য়-য়-য়’ বলে সমস্বরে যে আওয়াজটা উঠল,
সেটায় গলা মিলিয়ে ওষুধমাখা ডানহাতটা কপালে দুবার ছুঁইয়ে নিলাম। দুবার কেন বলতে
পারবনা, হয়ত একবারে ভরসা হয়নি। শুরুতেই যা হল! ভোর চারটেয় বাস ছাড়লে যা হয়, বাসের
মধ্যের আলোগুলো নিবে যেতেই, মিনিট পনেরোর মধ্যেই যাত্রীরা সবাই ঢুলতে লাগল।
দেবপ্রয়াগে এসে যখন বাস দাঁড়াল, তখন
সকাল প্রায় সাতটা। চা পানের ব্রেক, দশ মিনিটের। এই দেবপ্রয়াগ-ই যে আমাদের গঙ্গার
উৎপত্তিস্থল, চা খেতে খেতে টুস্কি মেরে এই জ্ঞানটা প্রদীপকে দিলাম। আর ও টপাং করে
সেটা গিলে নিল।
- সেকিরে! তাহলে গোমুখ?
- হুঁ হুঁ বাবা, আগে একটা ফিল্টার
উইলস খাওয়াও তারপর বলব।
- ঠিক আছে, ঠিক আছে, খাওয়াব। এখন
কেসটা তো বল।
- গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ারের স্নাউট গোমুখের
থেকে আসা ভাগীরথী আর অলকাপুরী গ্লেসিয়ারের স্নাউট থেকে বেরনো অলকানন্দা এই দেবপ্রয়াগে এসে মিশেছে। আর এখান থেকেই নদীর নাম হচ্ছে গঙ্গা।
- এটাতো জানতাম না তো বস্।
- অনেক কিছুই জানিস না। আর ওই জন্যই
তো আমি আছি রে। আচ্ছা বলতো, গঙ্গা শেষ হচ্ছে কোথায়?
- কোথায়? ও ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
- ধুলিয়ানে। তারপর আবার ভাগীরথী। আমাদের হালিশহরে ওটাই হুগলী নদী। চল, চল, সিগারেট খাওয়া। বিনি পয়সায় এত জ্ঞান সহ্য হবে না রে। আর শোন, একটা
পানপরাগের প্যাকেট নে।
রুদ্রপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ পেরিয়ে পৌনে
একটা নাগাদ বাস এসে দাঁড়ালো নন্দপ্রয়াগে। মালপত্র সহ আমরা নামলাম। বাস চলে যাবে
যোশীমঠ ছাড়িয়ে বদরীনাথ। রুদ্রপ্রয়াগে মন্দাকিনী, কর্ণপ্রয়াগে পিন্ডার গঙ্গা, আর নন্দপ্রয়াগে
নন্দাকিনী অলকানন্দায় এসে মিশেছে। এর ওপরদিকে বদরীনাথের পথে বিষ্ণুপ্রয়াগে মিশেছে
বিষ্ণুগঙ্গা, অলকানন্দায়। দেবপ্রয়াগকে নিয়ে এই পাঁচ প্রয়াগ মিলেই হল বদরীনাথ
যাওয়ার পথের বিখ্যাত ‘পঞ্চপ্রয়াগ’।
নন্দ্প্রয়াগ থেকে আমাদের রাস্তা
পূর্ব দিকে, যাব ‘ঘাট’ বলে একটা জায়গায়। সেই জায়গায় যাওয়ার বাস
দাঁড়িয়ে আছে। তাতে মালপত্র তোলা হল। প্রয়াগের ছবিও তোলা হল। এবং অবশ্যই চা ‘পান’
হল। এখানে এসে চা খাওয়া আর বলা যাচ্ছেনা। চায় ‘পি’ লিজিয়ে। বাস ছাড়ল কিছু সময় পর।
ঘাটে পৌঁছলাম দুটো নাগাদ। বাসের যাত্রাও এখানেই শেষ। ওরা মালপত্র নামাচ্ছে, আমি আর
সঞ্জয় বেরোলাম, ঘনশ্যামের খোঁজে। ঘনশ্যাম আমাদের গাইড হবে, বসতি ওয়ান গ্রামে।
কিন্তু সারা ঘাট খুঁজেও ঘনশ্যামকে পেলামনা। ওকে ইনল্যান্ড লেটারে লিখেছিলাম পুরো রুট জানিয়ে আর
বলেছিলাম দুজন পোর্টার নিয়ে আজকে এখানে চলে আসতে। ওর থেকে কোন জবাবি চিঠি পাইনি
অবশ্য। কিন্তু এখন কি হবে? দুপুরের খাওয়া মাথায় উঠল (সকাল থেকেও অবশ্য সেরকম কিছু
খাওয়া হয়নি)। এইবার দেখা যাক, অন্য কোন গাইড আর পোর্টার পাই কি না! পোর্টার না
পেলে খচ্চর ভাড়া করতে হবে। চল, আবার গ্রাম ঢুঁড়ি।
নাঃ, কোন গাইড বা পোর্টার পাওয়া
গেলনা। এখন তুমুল আলুর সিজন। আলু নামছে পাহাড়ের বিভিন্ন গ্রাম থেকে খচ্চরের পিঠে,
বস্তাবন্দী হয়ে। শীতকালে আমাদের ওখানে নৈনিতালের আলু বলে যা বিখ্যাত তা এই
আলুগুলোই। এইখান থেকে লরিতে করে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। সুতরাং, পোর্টার বা
খচ্চর মেলার কোন প্রশ্নই নেই। আর গাইড? ‘নাহ্, বহ্
তো হিঁয়াপে কোই নেহি হ্যায়’। অতঃকিম? প্রদীপ প্রস্তাব
দিল, খালি পেটে বসে থাকলে তো আর গাইড মিলবে না, আগে তো দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিই,
তারপর দেখা যাবে।
বাসস্ট্যান্ডে আমাদের বাসটাই দাঁড়িয়ে
আছে। আর একটা লরি। তাতে আলুর বোরা (বস্তা) তোলা হচ্ছে। আর এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে
গোটা কয়েক ধুলোমাখা দোকান। কিছু বাড়ি। তার মধ্যে একটা দোকানে নাকি খাবার মিলবে।
অতএব চল, যাওয়া যাক।
একটা কাঠ দিয়ে বানানো মলিন দোকানে
ততোধিক মলিন বাসনে ঠান্ডা ডেলা ভাত, গরম কিন্তু জোলো ডাল আর ধোঁয়া ওঠা অমলেট খাচ্ছি,
সঙ্গে একটা করে হরা মির্চ। মালপত্র দোকানের বাইরে
ডাঁই করে রাখা। আমার গলা দিয়ে ভাত আর নামছেনা। এবারে, রুট ঠিক করা থেকে ঘনশ্যাম,
সবটাই আমার দায়িত্বে হয়েছে। কি যে করি, পাগল পাগল লাগছে। এইসময়, দুজন পাহাড়ি
মানুষ, দোকানের সামনের রাস্তায় এসে দাঁড়ালো। আমরা তাকালাম। ওরাও আমাদের দিকে
তাকালো। তারপর দোকানের মধ্যে সেঁধিয়ে এসে জিগ্যেস করল, আপলোগ রন্টি স্যাডেল যায়েঙ্গে
কেয়া?
- হাঁ, কিঁউ?
- কলকাত্তা সে আয়া হ্যায় কেয়া?
আমার ভাত খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে – হাঁ,
আপ?
- ম্যায় ঘনশ্যাম সিং বিস্ত্, ওয়ান গাঁওকা।
- খীইইইইই ই ই ই ই! বেশ কিছু ভাত মুখ
থেকে ছিটকে বেরোল। ততক্ষণে আমি উঠে দাঁড়িয়েছি। অন্যদেরও খাওয়া বন্ধ।
- আপলোগ পহলে খা লিজিয়ে দাদা।
আরহামসে। কোই জলদিবাজি নেহি হ্যায়। হাম এঁহিপে বৈঠ্তা হুঁ। এইবলে ও দোকানে ঢুকে
বসে পড়ল। দ্বিতীয় ব্যক্তি বাইরেই দাঁড়িয়ে।
আর খাওয়া! আমাদের তখন নাচতে ইচ্ছে
করছে।
- আরে, আপ থা কাঁহা? হামতো পুরা ঘাট
ঘুম লিয়া, লেকিন আপকো পতা ভি নেহি মিলা।
- দাদা, এক রিস্তেদারকা মকান মে গয়ে
থে। ইস লিয়ে দের হো গয়া। আনে সে হি এক আদমি বোলা কি আপলোগ মুঝে ঢুন্ড্ রহে হো। ইসি লিয়ে তুরন্ত বাসস্টান্ড চলা আয়া। আরে দাদা, আপ আরহামসে খা লিজিয়ে।
উফ্, ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল।
ঘনশ্যামের ঠিক করে রাখা বাড়িতে একটা
বড় ঘর পেয়েছি। সেখানেই উঠলাম। একটা বেশ বড় চৌকি আছে ঘরে। আর আছে বেশ কিছুটা ফাঁকা
জায়গা। মালপত্র রাখা হল সেখানে।
সন্ধ্যেবেলায় মালপত্র রিপ্যাক করা
হল। ঘরে একটা টিমটিম করে বাল্ব জ্বলছে। তার সঙ্গে আমাদের মোমবাতি। আমরা এখন পুরো
রিল্যাক্সড্। ঘনশ্যামের সঙ্গে আসা পানু সিং আর সুন্দর সিং স্টোভে রান্না করছে। আজ
রাতের মেনু খিচ্ড়ি, হরা মির্চ, কাচ্চা প্যাঁজ অউর আলুপকোরা।
-৭-
১৫/১০/১৯৯৫
ধড়াম্…………উঁককক্।
আঁজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। সপাটে,
মুখ থুবড়ে একজনের উঠোনপতিত হওয়ার এবং প্রতিবর্তক্রিয়ায় তার মুখ থেকে বেরুনো
আওয়াজদ্বয়।
ভোর সাড়ে চারটে। বাড়িটার একমাত্র
বাথরুমে যাচ্ছিলাম। যেটা উঠোনের ওপারে। আর উঠোনের মাঝখানে একটা কংক্রিটের ঢিপি। চোখে
চশমা ছিলনা। দেখতেই পাইনি, অন্ধকারে। সেটাতে পা লেগেই যা হওয়ার হল। ভাগ্যিস চোখে
চশমা ছিলনা। তাহলে যে কি হত! দু’চারটে হাত দৌড়ে এসে টেনে তুলল। কানে এল, ‘এটার হল
কিরে? রাতে মাল ফাল খাচ্ছে না কি! কাল সকালে বেরোনোর সময় ধড়াম পড়ল, আবার আজকেও!’
ঘরের চৌকিতে বসিয়ে বাল্বের মিটমিটে আলোয় পর্যবেক্ষণ চলল। ডানহাঁটুটা কেটেকুটে
একসা। কালকের চোট পাওয়া ডানহাতের তালু আবার জখম। কিন্তু আসল মজা ডানহাতের তর্জনীর
ডগায়। নখের ভেতরের মাংস ভোগল্বা। টর্চের আলোয় সেই হাঁ করা গুহামুখে দেখা গেল,
বালির দানা ও অন্যান্য নোংরা জাঁকিয়ে বসেছে।
- তোকে ভোগাবে রে। ওপি গম্ভীর।
- কেন?
- ব্যাথা কমানোর ওষুধে কি আর সারবে?
নখের ভেতরটা হাঁ হয়ে ফেটে গেছে।
- তুই হয়েছিস কি?
- কিছুটা তো বটেই।
ঘাট থেকে বেরোলাম প্রায় সাড়ে ছটা।
বুনো ঘাসফুল আর সটান চেহারার গাছের ভেতর দিয়ে হাঁটাপথ সেঁধিয়ে গেছে। কিছুটা উঁচু,
কিছুটা নিচু। তাই পাহাড়ী সমতল বলা যায়। মিনিট কুড়ি হেঁটে শুরু হল চড়াইপথ। ধীরে
ধীরে উঠছি। দলের একদম শেষে। সঞ্জয় আমার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। বুঝেছি, আমায় একা
ছাড়বেনা। প্রায় একঘণ্টা হেঁটে দেখি একটা খোলা জায়গায় সবাই বসে আছে। জায়গাটা বেশ।
উঠে যাওয়া পথের বাঁহাতে নিচে নন্দাকিনী নদীকে দেখা যাচ্ছে এবার। আমরাও বসলাম।
বিশ্রামে।
সিতেল পৌঁছলাম প্রায় সাড়ে বারটা। এত
আস্তে হেঁটেছি আর এতবার বসেছি, যে কহতব্য নয়। প্রথমদিন হিসাবে পথটা বেশ। সিতেল-এ PWD-র বাংলোয় জায়গা পেলাম। একটা ঘর খুলে দিল চৌকিদার, বেশ বড়।
দুটো খাট একসঙ্গে। গদি, লেপ। আয়না, ভাঙা
ড্রেসিং টেবিল অবধি। আর শোয়ার ঘরের মাপে অ্যাটাচড্ বাথরুম। ব্রিটিশরা পারতোও
বাবা।
বাংলোর এক পাশে আলাদা কিচেন। ওখানে
ঝটপট খিচুড়ির হাঁড়ি বসে গেল। তারপর সারাদুপুর বাংলোর বাগান, আশপাশ, নদীর ওপারে
তাকিয়ে আর রোদছায়ায় পিঠ দিয়ে অলস সময় বয়ে গেল। শিবালিক হিমালয়ের অনাবিল সবুজ
গেরস্থালি আর কোবাল্ট ব্লু আকাশ গল্প করল, চুপিচুপি। গাছে গাছে পাখির
কিচিরমিচির আর ঠান্ডা বয়ে যাওয়া ঝিরঝিরে হাওয়া বড় আদ্র করে দিল মনটাকে।
সিতেলকে ভালবেসে ফেললাম।
সিতেলকে ভালবেসে ফেললাম।
১৬/১০/১৯৯৫
- আজ দো পড়াও। ইঁহা সে সুতোল, সুতোল সে
তাত্ড়া। কালকা মাফিক নেহি, আজ জলদি যানা হ্যায়, ঘনশ্যামের ঘোষনা।
কিন্তু ভোর থেকে যা বৃষ্টি। বেরোতেই
প্রায় সাতটা। তখনও বৃষ্টি কমেনি। উইন্ডচিটারের হুড দিয়ে মাথা ঢেকে আর প্লাস্টিক
দিয়ে গানিব্যাগগুলো ঢেকে হাঁটা শুরু হল। প্যাচপ্যাচে রাস্তায় সবারই গতি একটু ধীর।
বেশ কিছুটা যাওয়ার পর বৃষ্টি ছাড়ল। পাহাড়ি পথের আঁকাবাঁকা ছন্দ আর চড়াই-উৎরাই পেরোতে
পেরোতে আমরাও পায়ের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছি। আস্তে আস্তে রোদ উঠল। এবার একটু ভাল লাগছে।
রোদ ঝলমলে কুমায়ুন পাহাড় যে কি, তা না এলে বোঝানো মুশকিল।
দুপুর বারটার একটু আগে একটা ছোট চড়াই
পেরিয়ে এক জায়গায় এলাম। এখান থেকে বাঁদিকে ‘কুঁয়ারী পাস’ এর পথ চলে গেছে। আমরা
উৎরাই ধরে সুতোল গ্রামের দিকে এগোলাম। সুতোল এ ঢোকার আগে থাকতেই বোঝা যাচ্ছিল, বেশ
সমৃদ্ধ গ্রাম। চারিদিকে রামদানা-র (গম জাতীয় ফসল) ক্ষেত। হালকা লাল আর বাদামী রঙের
দানা হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। সুতোলে এক বাড়ির একতলার বারান্দায় দুপুরের খাওয়া
দাওয়ার জন্য বিশ্রাম। দুপুর প্রায় একটা। বড় গ্রাম, অথচ চারিদিক নির্জন।
একটা বড় ডেকচিতে চিঁড়ে ধুয়ে ছাতু, চিনি আর গুঁড়ো দুধের সঙ্গে মাখা হল। নাও, এবার খাবলা মারো। খাওয়ার মাঝে বাড়ির মালিক এসে উপস্থিত। ঘনশ্যামের সঙ্গে কি কথা হল জানিনা, বাড়ির মধ্যে থেকে বেশ কিছু আলু পুড়িয়ে নিয়ে এলেন। নুন দিয়ে সেই আলুপোড়া, আঃ।
একটা বড় ডেকচিতে চিঁড়ে ধুয়ে ছাতু, চিনি আর গুঁড়ো দুধের সঙ্গে মাখা হল। নাও, এবার খাবলা মারো। খাওয়ার মাঝে বাড়ির মালিক এসে উপস্থিত। ঘনশ্যামের সঙ্গে কি কথা হল জানিনা, বাড়ির মধ্যে থেকে বেশ কিছু আলু পুড়িয়ে নিয়ে এলেন। নুন দিয়ে সেই আলুপোড়া, আঃ।
সুতোল পেরিয়ে রূপকিনী নদী (রূপকিনী নদী এসেছে বিখ্যাত রূপকুন্ড থেকে) আর
নন্দাকিনী নদীর সঙ্গমস্থল পেলাম। কাঠের ব্রিজ পেরিয়ে শুরু হল টানা চড়াই। মাঝারি জঙ্গলের
মধ্যে দিয়ে। উঠছি তো উঠছিই। উঠতে উঠতে যখন দম ভারী,
সেই সময় কিছুটা সমতল জায়গা এল। আর দূর থেকে দেখলাম, দু’চারটে কাঠের বাড়ি। সেই সমতল
জায়গায় বড় বড় পাতাওলা (পালং পাতার ডাইনোসর সাইজ) ডাঁটা গাছের মতো চারিদিকে ফলে
আছে। তার মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে সেই বাড়িগুলোর কাছে এলাম। এটাই তাত্ড়া। আজকের
বিশ্রামস্থল।
তাত্ড়া আসলে সুতোল গ্রাম থেকে যারা ভেড়্-বকরী নিয়ে ওপরের দিকে চড়াতে আসে, তাদের অস্থায়ী থাকার জায়গা। তাই ঘরগুলো কাঠের খুঁটির ওপর, দোতলায়। একতলাটা পালিত জীবেদের থাকার জায়গা, ভোয়াল (ভেড়াদের গোয়াল)। একটা কাঠের মই দোতলার ছোট্ট বারান্দার সঙ্গে লাগানো। সেটা দিয়ে উঠতে হবে। বেশ বড় একটা ঘর পেলাম। তবে ভাড়া নেওয়ার জন্য কেউ উপস্থিত নেই। কোন বাড়িতেই কোন লোকজনকে পেলামনা এবং তাদের পুষ্যিগুলোকেও। বিকেল চারটে থেকে নামল বৃষ্টি। আহাঃ খাসা, একেই মুষলধারে বৃষ্টি বলে। আর সেটা থামল ঘণ্টা দুয়েক পর। তারপরও টিপটিপ।
তাত্ড়া আসলে সুতোল গ্রাম থেকে যারা ভেড়্-বকরী নিয়ে ওপরের দিকে চড়াতে আসে, তাদের অস্থায়ী থাকার জায়গা। তাই ঘরগুলো কাঠের খুঁটির ওপর, দোতলায়। একতলাটা পালিত জীবেদের থাকার জায়গা, ভোয়াল (ভেড়াদের গোয়াল)। একটা কাঠের মই দোতলার ছোট্ট বারান্দার সঙ্গে লাগানো। সেটা দিয়ে উঠতে হবে। বেশ বড় একটা ঘর পেলাম। তবে ভাড়া নেওয়ার জন্য কেউ উপস্থিত নেই। কোন বাড়িতেই কোন লোকজনকে পেলামনা এবং তাদের পুষ্যিগুলোকেও। বিকেল চারটে থেকে নামল বৃষ্টি। আহাঃ খাসা, একেই মুষলধারে বৃষ্টি বলে। আর সেটা থামল ঘণ্টা দুয়েক পর। তারপরও টিপটিপ।
১৭/১০/১৯৯৫
সকাল সাড়ে আটটা বাজল বেরোতে বেরোতে।
যেতে যেতে দেখি, কাছাকাছি পাহাড়গুলোর মাথায় আর গায়ে তুষার। কাল রাতে নিঃশব্দে ঝরে
গেছে কখন কে জানে। মিনিট কুড়ি এসেছি, একটা খুব সুন্দর ছোট্টমতো মাঠ পেলাম। কচি
সবুজ ঘাসে ঢাকা।
- একটু বসি, বুঝলি। রুকস্যাক নামিয়ে
রাখলাম।
- থক্ গ্যয়ে দাদা। ঠিক হ্যায়, আরহাম
কিজিয়ে। ঘনশ্যাম ভাবছে, একি এরা শুরুতেই বসে পড়ল।
- আরে নিকুচি তোমার থক্ গ্যয়ে-র।
তুমি ভাবছ, কখন ‘পড়াও’ শেষ হবে, টেন্ট খাটাব। আর আমি ভাবছি এই জায়গায় দ্বিতীয়বার আসতে
যখন পারবনা, দুচোখ ভরে দেখে নিই।
প্রথম প্রথম বাঁশ গাছের জঙ্গল, সঙ্গে
টুকটাক অন্য গাছরা। তারপর, ক্রমশ সেই অন্যদের ঘনত্ব বাড়তে বাড়তে এমন হল, যেন টর্চ
জ্বাললে ভালো হয়। এক একটা গাছের কান্ড দুহাতে বেড় দেওয়া যাবেনা। কান্ডের গায়ের
শ্যাওলা বলে দিচ্ছে, জগৎ সৃষ্টির সময় থেকেই এরা আছে।
পায়ের জুতো পুরোটাই ডুবে যাচ্ছে জল-কাদা
মাখানো পচা পাতার স্তুপে। সেই পেরিয়ে পেরিয়ে ক্রমশ
ঘন, ঘনতর ও ঘনতম জঙ্গলে ঢুকলাম। একটা গাছ পড়ে আছে। সেটা ডিঙিয়েই যেতে হবে। ফুট চারেক হবে কান্ডের ব্যাস। বুঝুন ঠ্যালা! যতবার সেটার গায়ের শ্যাওলা ম্যানেজ করে
ডিঙোতে যাচ্ছি, ততবারই হড়কান। কোনক্রমে সকলে হ্যাঁচোর ও প্যাঁচোরের সহযোগিতায় সেটা
পেরোলাম। পুরো উইন্ডচিটারের বুক আর হাতা জুড়ে আদিম, ঘন শ্যাওলা। একটা জায়গায় এসে
দাঁড়ালাম। জায়গাটা একটু ফাঁকা। বাঁদিকে একটা পাথরের ওভারহ্যাঙ। তার তলায় নাকি
রাতের থাকার জায়গা। তবে, আমরা আজ এগিয়ে যাব, ভুজানি পর্যন্ত। স্টোভ বার করে চা
তৈরী হচ্ছে। সঙ্গে চারটে করে বিস্কুট। দুপুরের খাবার। হঠাৎই মাথায় এল। একটা ছবি
তুলি জায়গাটার। এখন দুপুর পৌনে বারটা, মাথার ঠিক ওপরে সূর্যদেব। পরে যাকেই
দেখিয়েছি ছবিটা (ক্রোম ফিল্ম, স্লাইড) সবাই বলেছে সময়টা শেষ বিকেল, প্রায় সন্ধ্যে।
হ্যাঁ, এটাই লাটকোপরির বিখ্যাত, ভয়ঙ্কর, আদিম, ঘন জঙ্গল।
হ্যাঁ, এটাই লাটকোপরির বিখ্যাত, ভয়ঙ্কর, আদিম, ঘন জঙ্গল।
-৮-
পাহাড়ের গায়ের সরু খাঁজ ধরে ওরা একে
একে উঠে যাচ্ছে, পায়ের তলায় সদ্য ঝরা তুষার মাড়িয়ে। বাঁদিকে অতল খাদ। মাথার ওপর সারাক্ষণ তুষারের ঝিরিঝিরি। বাঁদিকে বেশ নিচে
একটা ছোট কুন্ড দেখা যাচ্ছে। নন্দা বলল, ওটার নাম রূপকুন্ড। গত দুদিন শুধু হাঁটা
আর হাঁটা। আর আজ তার সঙ্গে এই ভয়ঙ্কর, তীব্র ঠান্ডা হাওয়া আর প্রবল তুষারপাত।
বুকের ভেতরটা হাঁফ ধরে গেছে। মনে হচ্ছে ফেটে যাবে। জিভ শুকিয়ে উল্টে আসছে। পা দুটো
যেন আর চলতেই চাইছেনা। মনে হচ্ছে এক্ষুনি উল্টে পড়বে। কোথায় যাচ্ছে সেও তো বুঝতে
পারছেনা। শুধু উঠেই চলেছে। লখপত্ সিং পাহারাদারদের নেতা, তার
চোখমুখই বলছে সে ঘাবড়েছে বিস্তর। আর লছমিদের তো কথাই নেই,
যেন কাঠপুতলি সব। এখন স্বয়ং মহাদেব রক্ষা করুন।
অবশেষে, ওরা একটা পাহাড়ের কাঁধে উঠে
এল। ডান আর বাঁদিকে পাহাড় বয়ে গেছে। তাদের কারও মাথা সাদা, কেউবা কালো বা মেটে
রঙের। এবার নামতে হবে। কোথায় নামবে ওরা! পায়ের তলায় তাকালেই মাথা যাচ্ছে ঘুরে।
একবার যদি পড়ে যায়, আর দেখতে হবে না। গড়িয়ে গড়িয়ে কোথায় গিয়ে থামবে কে জানে। আদৌ
কি থামবে? নন্দা বলল, এই জায়গাটার নাম জিউন্রাগলি। এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক
নয়, তাড়াতাড়ি নেমে যেতে হবে। মেঘ উড়ে উড়ে আসছে, গায়ে, মুখে চারিদিকে মেঘ। দুহাত
দূরের কিছু দেখা যাচ্ছেনা। ওরা ভয়টাকে বুকের মধ্যে নিয়ে নামতে থাকল।
এখন পুরো দলটাই বসে আছে ছড়ানো ছিটানো
পাথরগুলোর ওপর। ওদের মনের ওপর দিয়ে যে কি গেছে, তা ওরাই জানে। কি ভাবে যে নেমে
এসেছে এই পাথরের রাজত্বে নিজেরাও ভাবতে পারছেনা। নন্দা লখপত্কে ডেকে বলল, পাহাড়ের
গোড়ায় তাঁবু ফেলার আয়োজন করতে। আজ যাত্রার এখানেই ইতি। এখন এখানে চারিদিকে বড় বড়
পাথর। এই জায়গার নাম শিলাসমুদ্র আর এটা নাকি একটা হিমবাহ! সত্যি সার্থক নাম বটে।
-৯-
১৮/১০/১৯৯৫ –
সকাল - ৮.৪৫
ভুজানি থেকে বেরিয়ে আমরা হাঁটা শুরু
করলাম। বেশ দেরী হয়ে গেছে। তাই নিয়ে ঘনশ্যাম বকাবকি করছে। বয়সে আমাদেরই সমান,
কিন্তু গাইড বলে কথা। সুতরাং, ওর কথা শুনতে হবে বৈকি! পাহাড়ের গা বেয়ে এগিয়ে
যাওয়া। ভেড়-বকরি নিয়ে যাওয়ার পথ। বড়জোর দু-বিঘৎ চওড়া। খুব ওঠা-নামা নেই। তবে পায়ের
তলার পথ সমতল নয়। পা পড়ছে প্রায় ৩০ ডিগ্রি কোণ করে। ঝকঝকে রোদ। এই সকালেই গা থেকে
ঘাম ঝরে পড়ছে। কে বলবে গতকাল বিকেলে কি গেছে! পাহাড়ের গা, এই দশ হাজার ফুটে,
ন্যাড়াই বলতে গেলে। কিছু ধুপিগাছ আছে। বেশ নিচুতে, অন্তত শ’পাঁচেক ফুট নিচু দিয়ে
নন্দাকিনী নদী বয়ে চলেছে। এখান থেকে দেখা যাচ্ছেনা। আমরা তার বাঁ তীর ধরে এগিয়ে
চলেছি, তারই উৎসমুখে।
ঘণ্টা আড়াই পর নদীর ধারে নেমে এলাম। এবার
নদী পেরোতে হবে। নিয়ম হচ্ছে, সকাল সকাল নদী পেরনো, জল কম থাকে। বেলা বাড়লে, তুষার
গললে, জলও বাড়ে। এখন প্রায় সাড়ে এগারটা। সুতরাং, একটু মুশকিলে পড়তে হবে। জুতো খুলে
স্যাকে বেঁধে নিলাম। ট্রাকস্যুটের লোয়ার হাঁটুর ওপর গুটিয়ে নিয়ে একেএকে নেমে পড়লাম
নদীতে। মনে হল যেন হাঁটুর তলা থেকে কেউ কেটে নিল, এতটাই ঠান্ডা। মাথার ওপর খর রোদ,
আর হাঁটু পর্যন্ত ডুবে আছে তুষার গলা জলে। আঃ, আর কি চাই! জয় মা নন্দা।
ওপারে গিয়ে কিছুক্ষণ নদীর ধার দিয়ে
চলা। একটু এগিয়ে দেখি, নদী তিনটে স্রোতে ভাগ হয়ে সামনে এক জায়গায় এসে মিশেছে। নদীর
চলার অভিমুখে একদম বাঁদিকের স্রোতটি আসছে শিলাসমুদ্র হিমবাহ থেকে। আর ডানদিকের
স্রোত দুটি নন্দাকিনীর। যেখানে মিশেছে, তার নিচু দিকে পেরনো যাবেনা। সুতরাং, মিশে
যাওয়া জায়গার আর একটু ওপরের দিকে গিয়ে আবার পেরোলাম, তবে নন্দাকিনীর স্রোতদুটো। এবার
আমাদের ডানদিকে শিলাসমুদ্র থেকে আসা স্রোত আর বাঁদিকে নন্দাকিনীর স্রোতদুটি। মাঝের বালি-পাথুরে অংশ দিয়ে আমরা এগোচ্ছি। বাঁদিকে আর সামনের দিকে কিছুটা দূরে
পাহাড়ের গা। ডানদিকে, একেবারে ঘাড়ের ওপর শিলাসমুদ্র হিমবাহ নিঃশ্বাস ফেলছে। এইবার হিমবাহের স্নাউটের সামনে চলে এলাম (স্নাউট মানে হিমবাহের মুখ, যেখান
দিয়ে জল বেরোচ্ছে। যেমন, গোমুখ হল গঙ্গোত্রী হিমবাহের স্নাউট)। এইখানে এসে শিলাসমুদ্র হিমবাহ থেমে গেছে। আমাদের থেকে প্রায় তিনতলা উঁচু
হিমবাহের ওপরতলটা। ডানদিকে শিলাসমুদ্র হিমবাহ, তার স্নাউট আর সেখান থেকে বেরোন
স্রোতকে রেখে বড় বড় বোল্ডার টপকে হিমবাহের অপর দিকটায় এসে পৌঁছলাম। একটু জিরিয়ে
নিয়ে, আবার সামনের রুক্ষ পাহাড়ের গা বেয়ে প্রায় সোজা টিকটিকির মত ওঠা শুরু হল। বেশ
কিছুটা উঠে আসার পর এবার পাহাড়ের গায়ে ট্র্যাভার্স করে যেতে হচ্ছে। কোনরকমে একটা
পা ফেলার জায়গা। ন্যাড়া পাহাড়। ধুলি ধুসরিত চারিদিক। সামনে এমন একটা জায়গা এল, যেটাকে
বলা যায়, একটা পাঁচিল শেষ হয়েছে। এখন, আপনি পাঁচিলের পেট
ধরে হাঁটছেন। ধরে নিন, পাঁচিলের শেষে একটা ইঁট বেরিয়ে আছে। এবার পাঁচিলের ওপিঠে
যেতে হবে। ডান পা সেই বের করা পাথরটায় রেখে, ডানহাতের আঙ্গুলগুলো পাহাড়ের ঝুরো
মাটি-পাথরে গুঁজে দিয়ে পিঠের রুকস্যাক সুদ্ধু এক হ্যাঁচকা টানে নিজেকে ওপিঠে নিয়ে
যেতে হবে। নিয়ে গিয়েই বাঁহাতের আঙ্গুলগুলো একইভাবে গুঁজে দিতে হবে। পড়ে গেলে অন্তত
সোজা পাঁচশো ফুট পতন।
-১০-
বড় বড় শ্বাস ফেলে ওরা হাঁফাচ্ছে।
শুধু হাঁফাচ্ছেই নয়, ওরা ক্লান্ত। শুধু ক্লান্তই নয়, ওরা ভীত। এ ভীতি মরণের। ওদের
স্নায়ু টানটান হয়ে আছে। টোকা দিলেই ঝনঝন করে বেজে উঠবে। ওদের চোখমুখ দেখলে মনে
হচ্ছে ওরা এখনই একটা কিছু করে বসবে। আর, অবশেষে ওরা তাই করল। বিদ্রোহ। নন্দা, ওদের
আদরের নন্দা, ওদের রাজকুমারী নন্দার বিরুদ্ধে, বিদ্রোহ।
- নন্দা দাঁড়াও, আমরা আর এগোবনা।
নন্দা দাঁড়িয়ে পড়ল। বাকিরা কাছে এলে
জিগ্যেস করল,
- কেন? কি হয়েছে?
চারিদিক থেকে ধেয়ে এল,
- কি হয়েছে? কেন? তুমি আমাদের কোথায়
নিয়ে চলেছ? এখানে মানুষ কোনদিন এসেছে? আমরা ফিরব কি করে? একি ভয়ঙ্কর জায়গা! আমরা
মরে যাব, নন্দা, আমরা মরে যাব।
একটু আগে যে সোঁ সোঁ হাওয়া দিচ্ছিল,
সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। মাথার ওপর মেঘ ঘন হচ্ছে। নন্দা একটা পাথরের ওপর বসে আছে,
থমথমে মুখ করে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আর সবাই, চারিদিকে।
- বেশ, তোমরা না গেলে আমি একাই যাব।
তোমরা ফিরে যাও। বাবা-মাকে বোল আমি কৈলাশ চলে গেছি।
- কৈলাশ যাবে! তুমি শিবঠাকুরকে বিয়ে
করবে! দেবীর অংশে জন্ম তোমার! আসলে এসব কিচ্ছুনা। তুমি একটা পাগল। নিজেও মরবে, আর
আমাদের নিয়ে এসেছ তোমার সঙ্গে মরার জন্য।
- বললাম তো, আমি একাই যাচ্ছি। আর কেউ
যাবেনা আমার সঙ্গে। তোমরা ফিরে যাও। ধমকে উঠল নন্দা।
- তুই যে বলছিস, কৈলাশ যাবি, এটা কি
কৈলাশের পথ?
লছমি বাল্যবন্ধুর দিকে তাকিয়ে
কুন্ঠাস্বরে বলল।
- জানিনা। তবে আরও আগে একটা কুন্ড
আছে। তার ধারে বসে আমি যজ্ঞ করব, মহাদেবের। এরপর নিশ্চয় তিনি দেখা দেবেন। আসবেন আমাকে
নিতে।
- দেবীর অংশে যে তোমার জন্ম, তার
প্রমাণ কি?
ধেয়ে এল প্রশ্ন।
- হ্যাঁ হ্যাঁ প্রমাণ কি?
- কি প্রমাণ চাও তোমরা?
একজন একটা পাত্র থেকে ঘিয়ের একটা দলা
বের করল। প্রবল ঠান্ডায় ঘি জমে কাঠ।
- এই ঘিয়ের দলাটা ওই পাথরের গায়ে ছুঁড়ে মেরে আটকাওতো দেখি!
নন্দা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে হাত
বাড়িয়ে নিল ঘিয়ের দলাটা। পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে ঘি। উঠে দাঁড়াল। একবার পিছন ফিরে
ওদের দেখল, তারপর মহাদেবকে স্মরণ করে ছুঁড়ে মারল ঘিয়ের শক্ত দলাটা সামনের বড়
পাথরটার গায়ে।
স্তব্ধ পাহাড় আরও স্তব্ধ। আর তারপরই....
স্তব্ধ পাহাড় আরও স্তব্ধ। আর তারপরই....
- জয় মহাদেবের জয়। জয় নন্দার জয়।
- না না তুমি তো নন্দা নও। তুমি আমাদের নন্দামাঈ।
- না না তুমি তো নন্দা নও। তুমি আমাদের নন্দামাঈ।
- জয় নন্দামাঈ-এর জয়।
নন্দার মুখে হাসি ফুটে উঠল। হাত তুলে
আশীর্বাদ করল সামনের সবাইকে। ওর বাঁপাশে শুকনো পাথরের গায়ে ঘিয়ের শক্ত ডেলাটা
আটকে আছে।
-১১-
১৮/১০/১৯৯৫
দুপুর – ১.১৫
- হাঁ জি, এহি হ্যায় ‘ঘিউথাপ্নি’।
ঘনশ্যাম পিঠের মালটা নামিয়ে রেখে
একটা বোল্ডারের ওপর বসল। আমরাও যে যার স্যাক রেখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলাম। চারিদিক তাকাচ্ছি। কোন পাথরের ওপর নন্দামাঈ ঘিয়ের ডেলাটা
ছুঁড়ে মেরেছিলেন কে জানে!
যেদিক দিয়ে
রূপকুন্ড (১৫,৭৩২ ফিট) হয়ে ভয়ঙ্কর জিউন্রাগলি (১৫,৮২৩ ফুট) পাস পেরিয়ে হোমকুণ্ডের
দিকে আসা হয়, আমরা সে রাস্তা না ধরে ঘাট, সিতেল, সুতোল হয়ে আদিম লাটকুবড়ি (লাটকোপরি)-র
জঙ্গল পেরিয়ে ভুজানি হয়ে এখন ঘিউথাপ্নিতে এসে পৌঁছেছি। আজই দোদাং পোঁছে যাব। পেছন
ফিরে চনোনিয়াকোটের দিকে তাকিয়ে আছি। জিউন্রাগলি পাস দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে
সম্পূর্ণ শিলাসমুদ্র হিমবাহ। এটাই আমাদের ফেরার পথ। এই পথে শিলাসমুদ্র হিমবাহের ডানপ্রান্তের ল্যাটারাল মোরেন ধরে ধরে আমাদের যেতে হবে। ঘনশ্যাম সেই পথটাই
দেখাচ্ছে। সত্যি বলতে কি, পথ দেখে দু-একজনের মুখে ভয়ের ছাপ লক্ষ্য করছি। আর সেটাই
চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যাক, যা হবে দেখা যাবে।
সাড়ে বারহাজার
ফিটের ঘিউথাপ্নিতে লাঞ্চব্রেক। পানু জানাল, সকালে ব্রেকফাস্টে কোন কোন সদস্য
একটার জায়গায় দুটো রুটি খেয়ে ফেলায় লাঞ্চে রুটি কম পড়েছে। তাই দশজনের জন্য চারটে
রুটি অবশিষ্ট আছে। অর্থ্যাৎ আধখানা করেও কপালে নেই। সঞ্জয় তাড়তাড়ি উঠে গানিব্যাগ থেকে চিনি বার
করল। শুকনো রুটি আর চিনি, জমজমাট লাঞ্চ। রুটি হাতে বসে বসে জিউন্রাগলি পাস দেখছি।
এমন সময় তিনি পড়া শুরু করলেন। তিনি মানে আমাদের তুষারবাবু। ছোট ছোট হোমিওপ্যাথি
গুলির সাইজে। সুতরাং তাড়াতাড়ি উঠতে হল।
এখন যে জায়গাটা
দিয়ে যাচ্ছি সেটা হল ত্রিশুল পর্বতশৃঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিমগাত্রের ন্যাড়া গা ধরে।
অবশ্য ত্রিশূল-১ পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা ৭,১২০ মিটার বা ২৩,৩৫৯ ফিট আর আমরা যাচ্ছি
সাড়ে বার থেকে তের হাজারে। পথটা বেশ মনোরম। ৪০ ডিগ্রি মত ঢাল। চারিদিকে বেশ লম্বা
লম্বা শক্ত ঘাস গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে আছে। সেই ঘাসগুচ্ছের গোড়ায় গোড়ায় পা দিয়ে দিয়ে যেতে হচ্ছে।
আমাদের ডানদিকে ত্রিশূলের গা উঠে গেছে, আর বাঁদিকে ঢালটা
কিছুদূর নেমে সোজা ৯০ ডিগ্রি কোণ করে প্রায় চার-পাঁচশো ফিট নিচে নন্দাকিনীর খাতে
নেমে গেছে। সুতরাং একবার পা ফসকালে, রুকস্যাক কাঁধে প্রথমে ৪০ ডিগ্রি ঢালে হু হু
গড়ানো, গুচ্ছঘাসের কোন গোড়া ধরে ফেললে সাময়িক বাঁচা, নিজে উঠতে পারলে বা কেউ নিচে
নেমে তুলতে পারলে ভাল, নাহলে তারপর সোজা ৯০ ডিগ্রি কোণ করে নন্দাকিনীর খাতে পাঁচশো
ফিটের পতন। সুতরাং মনের ওপর চাপ একটা তো থাকেই। আর সেই চাপটা সাংঘাতিক হয়ে উঠল
একটু পরেই। না না, বেশি ভয় পাবেন না, আমরাও ভয় কাটিয়ে উঠেছিলাম।
জায়গাটা পেরিয়ে কে কে লম্বা শ্বাস ফেলেছিল জানিনা, তবে আমি ফেলেছিলাম। একটু
বসা হল। একটা এক্লেয়ার্স, এক ঢোঁক জল। ঘনশ্যামকে দিয়ে নিজে একটা চারমিনার।
তুষারপাত হচ্ছিলই, এবার একটু বাড়ল। ফলে বেশিক্ষণ বসা গেলনা। সঞ্জয় কাছে এসে কানে
কানে বলল, আমরা একটু তাড়াতাড়ি এগোচ্ছি, টেন্ট ফেলতে হবে, রান্না করতে হবে, তুই
সঞ্জীব আর আশিসকে নিয়ে আয়। যাঃ বাবা, আমার ঘাড়ে দুটো! আশিস শুনে বলল, তুমি
সঞ্জীবকে নিয়ে এগোও আমি আমার মত আস্তে আস্তে যাচ্ছি। বেশ, ভাল কথা।
এবার এল বোল্ডারজোন। বোল্ডারজোনের বিপদ হল পা হড়কালেই চিত্তির। মানে ঠ্যাং
ভাঙতেও পারে, মাথা ফাটতেও পারে আবার দুটোর মাঝে সেরকমভাবে পা ঢুকে গেলে, ইয়ে, মানে
মিলিটারি ডাকতে হবে, নাহলে পাথর কেটে আপনার পা বের করবে কে! তাও প্রায় চারদিনের
ধাক্কা। কারণ কাছের বাসরাস্তায় নামতেই তো তিনদিন। ততদিন খোলা আকাশের তলায়
ত্রিশূলের গায়ে ঝুলে থাকুন!
টপকে, লাফিয়ে বোল্ডারজোন পেরোচ্ছি। এক একটা বড় বোল্ডার আছে, যার এপারে থাকলে
ওপার দেখা যায়না। ওরা সবাই পা চালিয়ে এগিয়ে গেছে। কাউকেই আর দেখা যাচ্ছেনা। পেছনে
আশিসকেও দেখছিনা। মাথা ঝুঁকিয়ে বোল্ডার দেখে দেখে পেরোচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি, সামনে
সঞ্জীব নেই। এখানে একটা কথা বুঝতে হবে, বোল্ডারজোনে কোনও পথের দাগ নেই, পথও নেই,
যে যার মত পথ বানিয়ে এগোয়। কোথায় গেলি ভাইরে! এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি, ডানদিকে
ত্রিশূলের গা ধরে উঠে যাচ্ছে। আরে এই কোথায় যাচ্ছিস? দাঁড়া শিগগির। কে শোনে কার
কথা। রুকস্যাক নামিয়ে ওর কাছে পৌঁছতে পৌঁছতেই হাঁফিয়ে একশেষ। ধরে ফেললাম ওকে।
- কোথায় যাচ্ছিস?
- কেন?
অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, যাচ্ছিতো!
- ইয়ার্কি হচ্ছে, যাচ্ছিতো। চল ঠিক করে।
ওকে ধরে, নামিয়ে বোল্ডাররের ওপর চড়ালাম। তখন কি আর জানি, এই সবে শুরু!
তুষারপাত ভালই হচ্ছে। ভাল মানে পরিমাণে বেশ হচ্ছে। সঞ্জীব একইভাবে দ্বিতীয়বার
পাহাড়ের গা চড়া শুরু করেছিল। নামিয়ে নিয়ে এসে একটা খুব বড় বোল্ডার (প্রায় ওভারহ্যাং)–এর
তলায় এনে বসিয়েছি। জলের বোতল বের করে জল খাইয়েছি। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে এসে
আশিসের খোঁজে এদিক ওদিক তাকিয়েছি। নাম ধরে দুবার ডাকলাম। সামান্য ইকো হল। একটু দাঁড়ালাম। ওর
দেখা নেই। কিন্তু তার থেকে জরুরি কাজ হল সঞ্জীবের শুশ্রূষা। আশিসের খোঁজ ছেড়ে আমি
ওভারহ্যাং-এর তলায় ফিরে এলাম।
ফিরে এসে দেখি সঞ্জীব চুপ করে বসে আছে। ওর পাশে এসে বসলাম। ওর যেটা হয়েছে সেটাকে
বলে, ‘হাই অল্টিচিউড সিকনেস’। প্রচণ্ড ভয়, ভয় না বলে আতঙ্ক বলা উচিৎ ওর মনে গেড়ে
বসেছে। অতি উচ্চতায় এই অসুখ হয়। মূলত হয়, অক্সিজেনের স্বল্পতার কারণে। দশ হাজার
ফিটের ওপর থেকেই এই অসুখের দেখা পাওয়া যায়। কেননা, দশহাজার ফিট উচ্চতার ওপরদিকে যত
যাবেন, ততই অক্সিজেন কমতে থাকবে। এর সঙ্গে যেটা যোগ হয়েছে, সেটা হল হিমালয়ের এই
গহন, দুর্গম, নিরালা অঞ্চলের মানসিক প্রভাব। সঞ্জীবের প্রশ্ন ও আচরণগুলো খেয়াল
করলে বুঝতে পারবেন।
- যদি এভাবে স্নোফল হতে থাকে, তাহলে কি হবে?
- একটু পরেই থেমে যাবে। তারপর আবার এগোব।
- তোমাকে কে বলেছে থেমে যাবে। তুমি কি জ্যোতিষি? হাত দেখতে জান?
- তোর কাছে এক্লেয়ারস আছে?
একটা লজেন্স বের করে দিল। আমি মুখে পুরে,
- ওই দেখ, কমে যাচ্ছে। [আদৌ না, ওকে ভোলানোর জন্য]।
তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি জল খেয়ে একটা চারমিনার ধরালাম।
- যদি সারারাত হয়?
- হলে হবে।
- তুমি কি আমার সঙ্গে ইয়ারকি করছ?
চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। মুখ লাল, ফুলো ফুলো। ওর চোখে চোখ রেখে দিয়ে
বললাম,
- শোন, ঠান্ডা মাথায় চুপ করে শোন। আমরা এইযে ওভারহ্যাং পেয়ে গেছি, এটাই
নন্দামাঈএর আশীর্বাদ। তোর আমার গায়ের ওপর ডায়রেক্ট স্নোফল হচ্ছেনা। সামনে একটা বড়
বোল্ডার, ফলে সামনেটাও বেশ আড়াল হয়ে গেছে। এখানে শোয়ার না হলেও প্রায় আধশোয়ার
জায়গা আছে। আমাদের স্যাকে ড্রাই ফুড বলতে বিস্কুট, ক্যাডবেরি, কাজু, কিসমিসের
প্যাকেট আছে, গ্লুকোস আর দু বোতলের একটু কম জলও আছে। সুতরাং কাল সকাল অবধি না খেয়ে
মরছিনা। এবার ভয়টা কমা। কিচ্ছু হবেনা। আমিও আছি। চিন্তা হচ্ছে বটে, কিন্তু তোর মত ভয় পাচ্ছিনা।
তখন অঝোরধারায় তুষারপাত হচ্ছে।
- রাতে কি করব?
- ম্যাট্রেস পেতে, স্যাক থেকে স্লিপিং ব্যাগ বার করে, সামনে স্যাকদুটো গার্ড
রেখে স্লিপিং ব্যাগ মুড়ি দিয়ে বসে থাকব। কাল সকালে যা হবার হবে।
- এই খোলা আকাশের তলায় আমি থাকব? আমি উঠলাম।
কোনরকমে ওকে আটকালাম। তারপর এটা ওটা সেটা গল্প, ভাল ভাল, মজার মজার।
বিকেল চারটে নাগাদ ওকে প্রায় দুহাত ঠেলতে ঠেলতে ১৩,৯০০ ফুটের দোদাং এসে
পৌঁছলাম। পাথরের খাঁজে ওরা তিনটে টেন্ট টাঙ্গিয়ে ফেলেছে। পৌঁছনোমাত্র সঞ্জয় গরম
কফির কাপ নিয়ে এসে আমার পাশে বসল। আসার পথে অনেকক্ষণ ধরেই আমার ডান হাতের
আঙ্গুলগুলোয় যন্ত্রণা হচ্ছে, বুঝছিলাম। এখানে এসে হাতমুঠো করতে গিয়ে আবিস্কার
করলাম, ডান হাতের গ্লাভসটা কখন খুলে পরে গিয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে! টেরও পাইনি যদিও বাঁহাতের গ্লাভসটি
অক্ষত।
-১২-
১৮/১০/১৯৯৫
বিকেল – ৫টা
দো-দাং হল দুটো পাথর। দুটো বড় পাথর ওভারহ্যাং (১২০-১২৫ ডিগ্রি কোণ) হয়ে আছে।
তার তলায় থাকার আয়োজন। যদিও ফোরমেন আর টুমেন টেন্ট দুটো একজায়গায় টাঙ্গানোর পরে আর
জায়গা না থাকায় একটু নিচুতে আর একটা টুমেন টেন্ট। তার সামনে পানুরা কিচেনের
প্লাস্টিক টাঙ্গাচ্ছে। বোঝা গেল ওরা ওই টেন্টটায় থাকবে। চারিদিকে জায়গাটা একটু
ছড়ানো। অনেক বোল্ডার। দৃষ্টি চলে বেশ কিছুদূর। পশ্চিমে, পাথরদুটোর পিঠেরদিকে, নন্দাকিনী
নদীর ঢাল আস্তে আস্তে নেমে গেছে। পূর্ব দিকে ত্রিশূল ১-২-৩ পর্বতশৃঙ্গ, যদিও এখান
থেকে দেখা যাচ্ছেনা। দক্ষিণ দিক থেকে আমরা উঠে এসেছি আর উত্তরে নন্দাঘুন্টি
পর্বতশৃঙ্গ, রন্টি স্যাডেল, হোমকুন্ড। কিন্তু এই বিকেলবেলায় সেখানে শুধু ঘন সাদা মেঘ, যা সবকিছু
আড়াল করে রেখেছে। আকাশে একটা মরা মরা আলো আছে। তাতেই চারিদিক পর্যবেক্ষণ করা হল।
পাথরের তলায় যেখানে টেন্টগুলো পাতা হয়েছে সেই জায়গাটার ভূমি অসমান। আবার জায়গা
পর্যাপ্ত না হওয়ায় কোন টেন্টই ভাল করে, মানে টানটান করে পাতা যায়নি। আউটারগুলো পেগ দিয়ে আটকানোর বদলে ছোটবড় পাথর
দিয়ে কোনরকমে টেনে রাখা হয়েছে। মূল দড়িটাও দুদিকে পাথর দিয়ে পেঁচানো আছে। একটু
জোরে হাওয়া দিলেই বা বেশি তুষারপাত হলেই আউটার-ইনার গায়ে গায়ে হয়ে যাবে। রাতে কি
অবস্থা হবে জানিনা।
থালায় করে এল গরম চিঁড়েভাজা। গরম বটে, তবে সেঁকার অবস্থা খুবই করুণ। ১৪,০০০
ফুটে গরম গরম প্রায় কাঁচা চিঁড়ে বাদামসহ, খারাপ কি! এরপর গরম কফি পেয়ে সারাদিনের
ক্লান্তি অনেকটাই কাটল। পেটেও দানাপানি কিছুতো পড়ল। আলো এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
তবে উত্তরদিক থেকে আসা হাওয়ার তীব্রতা অনেক বেড়েছে। খোলা জায়গায় এটা হবেই। আর তাই ওই দুটো
পাথরের কাছে আশ্রয় নেওয়া।
কফি-টফি খেয়ে খেয়ে মৌজ করে সিগারেট ধরিয়ে এর ওর পেছনে লাগা হচ্ছে। সঞ্জয়ের
হাতে সঞ্জীবের ভার। ও ওকে পাশে নিয়ে বসে আছে। আমি আসার পথের পুরো ঘটনাটা ওর
কানেকানে বলে দিয়েছি। ওপিকেও জানিয়েছি। ওপি আর সঞ্জয় আমাদের এই দুই বন্ধু ও দলের
সদস্য প্রশিক্ষিত পর্বতারোহী। দার্জিলিং-এর HMI থেকে Basic Mountaineering Course করে এসেছে ‘A’ grade সহ। এছাড়া পর্বতাভিযান, হাই অল্টিচিউড
ট্রেকিং-এর অভিজ্ঞতা আছে দুজনেরই। এদের সঙ্গে হাফ প্রশিক্ষিত আমিও আছি। কিন্তু
বাদবাকি চারজনের একমাত্র ট্রেকিং অভিজ্ঞতা, সান্দাকফু। সুতরাং, ‘রন্টি স্যাডেল’ যাব
আর কোন মুশকিলই হবেনা, এটা হতে পারেনা। অবশ্য আমরা সাত জনই এটা জানি।
অন্ধকার হয়ে এসেছে। হাওয়ার তীব্রতাও বেড়েছে। টেন্টে ঢুকে পড়তে হবে। শিডিউল
অনুযায়ী দোদাং পৌঁছতে পারলে, পরের দিনটা রেস্ট ডে। তার পরের দিন এখান থেকে
হোমকুন্ড এবং রন্টি স্যাডেল যাওয়া ও দোদাং ফিরে আসা। দোদাং-ই আমাদের বেসক্যাম্প।
এখানেই ত্রিরাত্রিযাপন।
ফোরমেন টেন্টটায় সবাই ঢুকে পড়লাম। নারকোলের টিন কেটে যে মোমদানি বানানো হয়েছে,
তাতে মোম লাগিয়ে শুরু হল অকশন ব্রিজ। আর শুরু হল গপ্প। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা হাতির
জোক শুনে সবাই হো হো। ওপি হা হা করে হাসির সঙ্গে পেছনদিকে হেলে পড়তেই মটাৎ করে
একটা আওয়াজ হল, আর টেন্টটা ঝুপ করে সবাইকার ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। সবাইকার মাথায় হাত।
কোনরকমে মোম নিভিয়ে, সকলে বাইরে এসে, অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে দেখি টেন্টের দক্ষিণ
দিকের অ্যালমুনিয়ামের পোলটা ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গেছে। পোলটার অবস্থা দেখে ভাবছি, সারারাত
কি হবে! টর্চ জ্বালিয়ে এদিক ওদিক দেখছি, আর ওপিকে গালমন্দ করছি। কে যেন একটা গাছের সরু ডাল পেয়ে গেল। এই উচ্চতায় কোথা থেকে এল কে জানে! সেই
ডালটা ভাঙা পোলের টুকরো দুটোর মাঝখানে গুঁজে পোলটার ভাঙা হাড় জোড়া লাগানো হল। আর
টেন্টটাও দুলতে দুলতে খাড়া হয়ে গেল। নিশ্চিন্ত হয়েই কে যেন বলল, একটা হাতি ছিল...। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল জোক শুনে বিরত দেওয়া হো হো হাসি, আবার।
তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মত বাতাস মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। সোঁ সোঁ করে আওয়াজ হচ্ছে
তীব্র। উইন্ডচিটারের হুডটা কানে-মাথায় ভাল করে
বেঁধে নিয়েছি। রাত সাড়ে আটটা। টেন্টের বাইরে বেরিয়েছি আমি আর সঞ্জয়। এখন কৃষ্ণপক্ষ। দূষণহীন
আকাশ তারায় তারায় ছয়লাপ। জ্বলজ্বল করছে তারাগুলো। আর এক একটা এই অ্যাত্তো বড় বড়।
বসে বসে পা ধরে গেছিল, তাই দুহাঁটুতে দুহাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাঁটু ছাড়াচ্ছি।
সঞ্জয় হাঁক পাড়ল,
- ঘনশ্যাম, ডিনার রেডি হুয়া?
- হো গ্যয়া দাদা, থোড়া, পাঁচ মিনিট।
কিছুক্ষণ পর ওরা রান্না করা খিচুড়ির কুকার নিয়ে বাইরে এল। টেন্ট থেকে মেসটিন
বার করলাম। আর পকেট থেকে চামচ। কি আশ্চর্য, খিচুড়ির সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, লঙ্কা তো
আছেই সঙ্গে আবার একটা করে গরম অমলেট! হাঁটার চোটে কাঁচা ডিমগুলোর কথা ভুলেই গেছিলাম।
-১৩-
১৯/১০/১৯৯৫
সকাল – ৭টা
চোখের সামনে নন্দাঘুন্টি। চোখ মেলে তার অপরূপ শোভা, তার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য
দেখে যাচ্ছি। একটু ডানদিকে রন্টি স্যাডেল। আর পূবদিকে ত্রিশূল (১-২-৩)। এখন সকাল সাতটা। বেসক্যাম্প থেকে উত্তরদিকে
বেশ কিছুটা উঠে এসে একটা পাথরের ওপর বসে আছি। নন্দাঘুন্টি পর্বতশৃঙ্গ (৬৩০৯ মিটার /
২০৬৯৯ ফিট) থেকে পূর্ব দিকে একটি গিরিশিরা (Ridge) নেমে এসে দক্ষিণ-পূর্বমুখী হয়ে আবার
পূর্ব দিকে উঠে গেছে। উঠে গিয়ে ত্রিশূল-১ পর্বতশৃঙ্গের (৭,১২০ মিটার / ২৩,৩৫৯ ফিট) সঙ্গে মিলেছে। এই গিরিশিরার এক জায়গায়
উত্তর-পূর্ব কোণে একটা ‘কল’ আছে। কল-কে বলতে পারেন শৃঙ্গের কাঁধ আবার কোথাও এই
উচ্চতায় কল মানে গিরিশিরার ওপারে যাওয়ার জায়গা। এখানে কল’টা ঘোড়ার পিঠের জিনের
আকারে, তাই একে স্যাডেল বলা হয়। আর সেই কারণেই এর নাম ‘রন্টি স্যাডেল’। রণ্টি
পর্বতশৃঙ্গ নন্দাঘুন্টির উত্তরদিকের গিরিশিরায়, যেন জমজ বোন। আর স্যাডেলের ওপারে,
নিচে রন্টি হিমবাহ। ত্রিশূলের উত্তরে বেতারথলি ও নানা পর্বতশৃঙ্গ। এই সম্পূর্ণ
জায়গাটি ভাল করে দেখতে হলে আপনাকে রন্টি স্যাডেলে চড়তেই হবে।
অনেক টেকনিক্যাল কথা হল, আপনাদের ভাল নাও লাগতে পারে। তবে ‘হিমালয়ের অন্দরমহল’
কি, এককথায় জানতে গেলে বাক্স-প্যাঁটরা ঘাড়ে একবার এখানে আসুন। আপনাকে প্রশিক্ষিত পর্বতারোহী
হতে হবেনা, শুধু শারীরিক সক্ষমতা চাই, তার জন্য একটু ফিজিকাল ট্রেনিং দরকার আর
দরকার ভাল গাইড। আর যেটা না থাকলে আসতেই পারবেননা, সেটা হল, আমাকে যেতেই হবে এই
সুতীব্র ইচ্ছা, যার অপর নাম ‘টান’।
আজ রেস্ট ডে বলে সকলের মধ্যেই একটু ঢিলে ভাব। এই দাঁত মাজছি, এই চা খেলাম
এইরকম আর কি! দশটা নাগাদ জমিয়ে আলুপরাঠা আর আচার দিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে করতে
প্রস্তাব উঠল, বসে থেকে কি হবে তার থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে রাস্তাটা দেখে আসি।
ঘনশ্যামকে বলা হল, কাল তো হোমকুন্ড হয়ে রন্টি স্যাডেল যাবই, তা আজকে বরং হোমকুণ্ড
অবধি যাই, আর বাকি রাস্তাটাও দেখে নি। অতএব, ব্রেকফাস্ট করে ঝাড়া হাত পায়ে
ঘনশ্যামকে নিয়ে আমরা সাতজন চললাম হোমকুন্ডের উদ্দেশ্যে। টেন্ট রইল, মালপত্র রইল,
পানু আর সুন্দর রান্না করার জন্য আর রেস্ট নেওয়ার জন্য রইল, দোদাং-এ।
কাল সারারাত তুষারপাত হয়েছে। তুষারের চাপে টেন্টের আউটার ইনারের সঙ্গে এক হয়ে
বারবার গায়ের মধ্যে পড়েছে। মধ্যে মধ্যে স্লিপিং ব্যাগের চেন খুলে হাত দিয়ে যতটা
ঠেলে সরানো যায় সরিয়েছি, বাদবাকি সময় ধুত, যা হবার হবে বলে তুষারভেজা টেন্ট গায়ের
ওপর নিয়েই ঘুমিয়েছি। কাল রাতে সঞ্জীবের শরীর খারাপ হয়েছিল। ও ছিল প্রদীপ আর আশিসের
সঙ্গে পাশের টুমেন টেন্টে। রাতে ওকে বারতিনেক টেন্ট থেকে বের হতে হয়েছিল পেটের
সমস্যায়। সকালেও শরীর ভাল নয়। তবু জোর করেই আমাদের সঙ্গে আজ যাচ্ছে।
দোদাং থেকে বেশ কিছুটা চড়াই উঠে, সকালে যেখানে বসেছিলাম সেখানে এলাম। ঝকঝকে
নীল আকাশ। সঙ্গে সুতীব্র ঠান্ডা হাওয়া, ফাউ। নন্দাঘুন্টি, রন্টি স্যাডেল, ত্রিশূল
(মাথার কাছে একটু মেঘ জমেছে) দেখছি। তবে বেশিক্ষণ দেখতে গেলে হাঁটা থামাতে হচ্ছে,
তাই একঝলক দেখেই আবার হাঁটছি। পথটা উত্তরদিকে, তবে একটু পূব ঘেঁসে।
কিছুক্ষণ পর সামনে একটা রিজ (গিরিশিরা) এল। তীক্ষ্ণ তার ধার। সোজা চলে গেছে উত্তরপূব
দিকে। বাঁদিকে এবং ডানদিকে যুগপৎ খাদ, অন্তত হাজার খানেক ফুট করে তো বটেই। মাঝের
এই গিরিশিরার মাথা ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। পায়ের তলায় তুষার পাচ্ছি। এত বেলাতেও গলেনি। ক্রমশ তুষারের রাজত্ব
বাড়তে লাগল।
দড়ির ওপর হাঁটা দেখেছি, নিজেদেরও যে এতক্ষণ ধরে প্রায় সেই অবস্থায় হাঁটতে হবে
কে জানে! ঘণ্টা খানেক লাগল, পা পা করে পায়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে যেতে হচ্ছে বলে।
হঠাৎই সামনে একটা চিৎকার। বোঝা গেল, এসে গেছি। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি রিজের ডানদিকে
একটা কুন্ড। যদিও একটুও জল দেখা যাচ্ছেনা, সবটাই বরফের চাদরে মোড়া। আমি এখন
দাঁড়িয়ে আছি একটা কড়াই-এর মাথায়, আর কড়াইএর নিচে নামতে হবে। সবাই গ্লিসেড করে
নামছে, আমিও তাই নামলাম।
এই সেই হোমকুন্ড। এখানেই হোম করে নন্দা শিবের সাক্ষাত পান, এবং শিবের সঙ্গে
কৈলাশ চলে যান। তাই এই কুন্ডের নাম হোমকুন্ড। কুমায়ুনের
মেয়ে নন্দা আর বাংলার মেয়ে দুর্গার মধ্যে কোন ফারাকই নেই। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে
থাকলাম। সম্পূর্ণ কুন্ড বরফে জমে আছে। ওপারে একটি পাথরে নন্দামাঈ-এর পূজো হয়। সেই
জমা বরফের ওপর দিয়েই কুন্ডের ওপারে যাচ্ছে সবাই। এগোলাম।
এত হুটুপুট কোরনা সোনা – সঞ্জয় বকে উঠল। যার ওপর দাঁড়িয়ে আছি সেই কুন্ড বরফের
চাদরে মোড়া বটে, কিন্তু যদি কোথাও তার আস্তরণ পাতলা হয়, আর ঠিক তারই ওপর সোনামনারা
হুটুপুটু করে তবে পাতলা বরফ ভেঙে কুন্ডের জলে তলিয়ে যেতে কণামাত্র সময় লাগবেনা।
সুতরাং সলিল সমাধির চিন্তায় সঞ্জয়ের বকুনি স্বাভাবিক।
কুন্ডের ধারে একটি পাথর, সিঁদুর মাখানো। পাথরের পায়ের কাছে কিছু ফুল। আমাদের পুজোর
সামগ্রী বার করা হল। গাইড ঘনশ্যামই পূজারী। মোমবাতি, ধূপ জ্বালানো হল, নারকোল
ফাটানো হল, প্যাকেট থেকে নকুলদানা আর ক্যাডবেরি বার করে পুজো দেওয়া হল।
- জয়-য়-য় নন্দামাঈ কি।
- জয়-য়-য়।
১৫,১৯০ ফুটের হিমালয় মুখরিত হল আমাদের ধ্বনিতে।
-১৪-
১৯/১০/১৯৯৫
সন্ধ্যে – সাড়ে ৬টা
যদিও আকাশে একটু হলেও আলো আছে কিন্তু আমাদের ঘিরে এখন গভীর অন্ধকার। সবাই
চিন্তান্বিত। কি হবে? রন্টি স্যাডেল কি যাওয়া হবেনা কাল? তীরে এসে কি শেষে তরী ডুববে?
সঞ্জীবের শারীরিক অবস্থা শোচনীয়। প্রায় আন্ত্রিকের মত অবস্থা। নেতিয়ে পড়ে আছে।
প্রদীপের ডান গাল বাঁ গালের থেকে তিনগুণ ফুলে গেছে। বাবুদা বলছে, আমি এখনই নিচে
চলে যাব। আমরা বাকিরা টেন্টে চুপ করে বসে আছি।
দুপুরে হোমকুন্ড থেকে ফিরে এসে লাঞ্চ করে রোদে বসেছিলাম। টেন্টের আউটারগুলো
রোদে শুকোতে দেওয়া হয়েছে। ঠিক এমন সময় থেকে সঞ্জীবের পেটের সমস্যা আবার শুরু হল।
ওষুধে কোন কাজই হচ্ছেনা। এমন সময় প্রদীপের দিকে খেয়াল পড়ল। আরে ওর ডান গাল ফুলে
আছে কেন! কে যেন সেটা প্রদীপকে বলল। আর তখনই বাবুদা বলল, আমি কাল রন্টি স্যাডেল
যাবনা, আমার শরীর খারাপ লাগছে, নিচে নেমে যাব। আরে যাবে তো বুঝলাম, কিন্তু কার
সঙ্গে যাবে, একা একা?
এসবই উচ্চতাজনিত অসুখ। এক এবং একমাত্র সমাধান, যত দ্রুত সম্ভব সেই সদস্যদের
নিয়ে নিচে নেমে যাওয়া, অর্থ্যাৎ পর্বতারোহণের চলতি ভাষায় ‘অল্টিচিউড লস’ করা।
টেন্টের মধ্যে ঘনশ্যামকে ডাকা হল। আলোচনা শুরু হল করণীয় নিয়ে।
আলোচনা শেষে ঠিক হল, কাল ভোর সাড়ে চারটেয় ঘনশ্যাম, সঞ্জয় আর আমি সামান্য পুজোর
সামগ্রী, খাবার জল আর ক্যামেরা নিয়ে হোমকুণ্ড হয়ে রন্টি স্যাডেল যাব, আর টেন্ট
ফেন্ট গুটিয়ে স্যাক আর মালপত্র প্যাকিং করে আকাশে আলো ফুটলেই বাকিরা নিচে নেমে
যাবে। শুধু আমাদের তিনজনের রুকস্যাক দোদাং-এ পড়ে থাকবে, রন্টিস্যাডেল থেকে ফিরে
এসে নিজেদের রুকস্যাক নিয়ে আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি নেমে গিয়ে পথে ওদের ধরে নেব।
-১৫-
২০/১০/১৯৯৫
সকাল – সাড়ে ৫টা
সবাই দোদাং থেকেই ফিরে যাচ্ছি।
কাল রাতে সঞ্জীবের যা হয়েছিল, তাতে আমাদের অবস্থা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’।
শেষের দিকে কোন সাড়া নেই। মনে হচ্ছিল এখনই বোধহয় গেল। প্রদীপের অবস্থাও খুব ভাল নয়। মাঝরাতে সিদ্ধান্ত নিতে হল, আর নয়, ফিরে
চল। কেননা, একমাত্র সুস্থ সদস্য ওপির পক্ষে তিনজনের মালপত্র এবং সেই অসুস্থ
তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে একার দায়িত্বে নিচে নেমে যাওয়া আত্মহত্যা করার সামিল। ফলে রাত
থাকতেই টেন্ট গুটিয়ে মালপত্র প্যাকিং করে সঞ্জীব আর বাবুদার মালপত্র ভাগাভাগি করে
সঞ্জয়, ওপি আর আমি তিনজনে ওদের নিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম।
কিছুটা নেমে এসে দাঁড়ালাম। ফিরে তাকালাম। সবে আলো ফুটেছে। নন্দাঘুন্টির শৃঙ্গে
সেই আলো গিয়ে পড়েছে। আর দেখা যাচ্ছে রন্টি স্যাডেলকে। আবছা।
জয় নন্দামাঈ
কি.........

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন