বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

নি:সঙ্গ মান্দাস


আমার বড়ো বয়সে একটাও দোয়েল পাখি দেখিনি কোনদিনকী মজা হতো যদি রেলগাড়ি চলে যেত অপার সবুজে। তাহলে হাফপ্যান্ট পরা বয়স মাঠে মাঠে দৌড়ে একাকার। কোথায় চলে গেছে অনন্ত কথা বলা মানুষেরা, শীতলেপে মুড়ি দেওয়া ঠাকুমার ঝুলি। মাঠের আল বেয়ে সীমানাহীন পথে এগিয়ে যাওয়ায় মনকেমন করে ওঠে ঘুমভাঙা সকালে রোজ। অতীতজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এইসব আদুরে যাপন।

সাদা দাড়ি বুড়ো মাঝিকে আমি নদী পার করে দিতে বললাম। সে বগলদাবায় নৌকো নিয়ে চলে গেলো। ঘাসের সবুজ গন্ধঅলা একলাপথে এ আমি কার অপেক্ষায়?


এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলুম। পাহাড়ের ওপারে হারিয়ে গেছে সমস্ত ছেলেবেলা। ছলছলাৎ করে পা ভিজিয়ে দিচ্ছে মনকেমন করা জলের সুর। অন্ধকার ভেঙে সূর্যপ্রণামে যেতে কষ্ট হয় খুব। তবু সকালের তানপুরায় বেজে ওঠে আবাহনের নিবিড়তা।
শুধু, সে আসবে বলে অন্যকোনো অঙ্গীকার রাখিনি।

শব্দছোঁয়া দিগন্ত ছিলো আকুল নৈঃশব্দের আড়ালে। কাটুম-কুটুমের ছোঁয়ায় ধরা দিয়েছিলো বন্ধুবিহীনতার বেদনা। পলাশের আগুনে লালচে হয়ে উঠেছিলো একা থাকার রাতলিপি। হাতের পাতায় রাখা ছিলো কেয়াপাতার নৌকো। লতাবিতানে কেঁদে উঠেছিলো পশ্চিমের রাত্তির।
এ কোন্‌ বৌদ্ধিক নিবেদনে হৃদয়জুড়ে রক্তের হোলিখেলা!

তার আসবার কথা ছিলো বলে দুহাতে কুয়াশা সরিয়েছে ভোরবেলা। টুপটাপ শিশির লাল কাঁকরের পথের সাথে হিমে ভেজা সুখে। অজানা বুনোফুলেরা অনাঘ্রাত থেকেছে নির্ঘুম পাহারায়। হাসিরাশি প্রতীক্ষায় ছিলো অন্তহীন গরাদচাপা প্রহর। আকাশের চালচিত্রে কেউ এঁকে দিয়েছিলো বসন্তের কৃষ্ণচূড়া
তার না আসা পথকে বুকে রেখে এইমাত্র সন্ন্যাস নিলুম আমি।

ম্যাকলাস্কিগঞ্জের নুড়ি ছড়ানো রাস্তায় কোনো এক শীতসন্ধ্যায় একা একা। লালরঙা টালি দেওয়া বাড়িগুলোর ছাদে টুপটাপ তারার টুকরো। জ্যাকারান্ডা গাছের ডালে বেজে উঠছে শব্দহীন অর্গানের সুর। সেই শব্দহীন সুরের কথামালা জপতে জপতে দু-চারটে বুনোফুল ফুটে চারিদিকেকাশ্মীরি শাল গায়ে দিয়ে তাদের খুশিতে খুশিয়াল শীতের মনকাড়া সন্ধ্যা।
একটাই তো জীবন। না হয়, ঘুমের ভেতর হেঁটে যাবো সারাটারাত।

এই তো সেদিন। নজর ফেরানো আকাশে তারারা বড়ো একা ছিলো। হলুদ-সাদা চন্দ্রমল্লিকায় ঢেকেছিলো জামদানী শাড়ি। জলতরঙ্গে বেজে উঠেছিলো অভিমানের অনুক্ত কথারাশি। সাঁঝের চুলে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে কে যেন সুগন্ধ ছড়িয়ে গেলো এলোমেলো। বিয়ের পিঁড়িতে এঁকে গেলো ভালবাসার সজলতা। বিষন্নতায়। একা একা হেসেছিলো কেউ। যদিও তার মুখে বিকেল শেষের শূণ্যতা আঁকা ছিলো।
আমিতো হারিয়ে যাইনি। কালবৈশাখীর দাপটে মাথা নুইয়ে ছিলুম শুধু।

অন্তহীন অপেক্ষায় জানলার শিকে মুখ চেপে কেঁদেছিলো কেউ। কথা ছিলো ভালবাসার চিঠি আসবে ডাকবাক্সে। যখন তারার আলোয় ধ্বকধ্বক করছে মাঝরাত্তির, তার শিয়রবালিশে ভেঙে পড়ছে হাওয়ার সমুদ্র। এই যক্ষপুরীর নিরেট দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে তার মনে হয়েছিল – ‘আমি চঞ্চল হে.........’

যে বৃষ্টি ভিজতে ভালোবাসে খুব, তার একাকিত্বের দোসর হতে আকাশ পাঠিয়েছে জলকণা। ভিজে যাচ্ছে ভেসে থাকা কচুরিপানার গায়ে লেগে থাকা সরল প্রজাপতির দলমাঠ পেরিয়ে ডিঙি ভাসে গাঙে। গাঙচিল উড়ে উড়ে সারাটাপথ গভীর বিষাদে ঢেকে থাকছে তার একা থাকার পবিত্র রাতগুলো।

১০
দুর্গাপ্রতিমার আদলে জ্যোৎস্না ছিলো কাল বহুক্ষণ। বেতলার সাদা জঙ্গলে তাই বাঘ ডেকেছিল মহুয়াপর্বে। ছাই ছাই খরগোশেরা এই পৃথিবীতে দৌড়ে যাচ্ছে দ্রুত। আমার ঘামে ভেজা হাতের মুঠো থেকে এইমাত্র পালিয়ে গেলো কোট্‌রা হরিণের দল। মারুমারের বাংলোয়, তোমায় স্বপ্নের ভেতরে আদরে আদরে সারাটারাত

১১
চোখ-আকাশে মেঘ ছিলো। বাজকুড়ুল পাখির ঠোঁটেতে উড়ে যাচ্ছে একচিলতে আকাশ। বৃষ্টির ধারাপাতে দুজনে ভিজে ভিজে একাকার। তোমার নাকছাবি ঠিক্‌রে বেরোচ্ছে গোধুলিসন্ধ্যাএকরাশ খুশি ছড়িয়ে রামধনুতে মিশে যাচ্ছে কয়েকমুঠো জ্যোৎস্না।
এই তো ডেকেছি। হাত ধরো তুষার-সমুদ্রে।।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন