বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ভোজ



হুহু করে বিকেল তিনটের বাসটা চিপলি বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল। খালাসি ছেলেটা দরজা খুলে নেমে দরজায় দুটো চাপড় মেরে, ফুররর ফুররর করে হুইসিলটা বাজিয়ে সরে দাঁড়াতে একজন একজন করে নামতে থাকল। সাত-আটজন নামার পর আর কাউকে নামতে বা উঠতে না দেখে ছেলেটা ফুররর বাজিয়ে দিল। বাসটা ছেড়ে দিয়ে সামনের পুলিশ ফাঁড়ির মোড়ে ডানদিকে ঘুরে পিপরৌলির দিকে চলে গেল। যে যার বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে এবার এদিক ওদিক রওনা দিতে বাসস্ট্যান্ড জায়গাটা খালি খালি হয়ে গেল।


হরিয়ার সাইকেল সারানোর দোকানের পাশ দিয়ে তখনই মুংরু বেরিয়ে এল। এমন না যে লোকজন থাকলে মুংরু সামনে আসবেনা। আসলে ও তখনই ওখানে এসে পৌঁছেছিল। রাস্তাটা আনমনে কোনাকুনি পেরিয়ে এপারে এসে ফরেস্ট বাংলোর দিকে হাঁটতে লাগল। ফরেস্ট বাংলোর ডানদিকটায় কাঁটাতারের বাইরে অনেক শুকনো ঝরা পাতা জড়ো করা হয়েছেএকটা ঢিপি মত হয়ে গেছে। এই সময় ফরেস্টবাবুরা আসে মাঝেমাঝেই। ‘চেকিনে’। তাই বাংলোর হাতার মধ্যেটা সাফসুতরো রাখছে। বিনোদ এই ব্যাপারে খুব চালু ছেলে। বাপ মরে যেতে ডালটনগঞ্জে দৌড়দৌড়ি করে বাপের চৌকিদারীর কাজটা বাগিয়ে নিয়েছে। তা ভালই হয়েছেলেখাপড়া শিখে বসেই ছিল। কিইবা করবে। একবার শুনেছিল রাঁচি চলে যাবে। ওখানে চাকরি করবে। তারপর শুনল, বাসস্ট্যান্ডে দোকান দেবে। সবকিছু এইভাবেই শুনে যায় মুংরু। আর মাঝেমাঝে মাথা নাড়ায়। তাও চুট্টা মুখে থাকলে। নয়ত আজকাল কথা খুব কম বলে। শোনেও না সব। তবে মাথা নাড়ায় খুব শোনার সময়

বাংলো পেরিয়ে বড় জারুল গাছটার পাশ দিয়ে রাস্তাটাকে পিছনে রেখে জঙ্গলের দিকে পা বাড়ায় ওঅবশ্য এখানে তো সবই জঙ্গল। কোথাও হালকা আর কোথাও ভারী। একটা বুঁ বুঁ আওয়াজ পাচ্ছিল কিছুক্ষণ থেকে। এবার ওর পিছন দিয়ে আওয়াজটা চলে গেলে বুঝল একটা গাড়ি চলে গেল। এ রাস্তায় এখন অনেক গাড়ি হয়েছে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল মুংরুর। তখন গাড়ি বলতে দিনে তিনটে বাস আর ফরেস্টবাবুদের জিপ মাঝেসাঝে আনাগোনা করত। আর কিছু ‘টুরুস্ট’ গাড়ি যেত। বাংলোতেও শীতকালের দিকে ‘টুরুস্ট’ আসত। কতদিন হল, এখন কেউ আসেই না। ও একটু বড় হয়ে ‘টুরুস্ট’দের ফলস্‌ দেখাতে নিয়ে যেত। তখন বিনোদের বাবা টেপিয়াচাচা ছিল চৌকিদার। টেপিয়াচাচাই ওকে এই ব্যবস্থা করে দিত। আর সেই সুযোগে দু’চার টাকা রোজগারও হয়ে যেত ওর।

জঙ্গলের মাঝ দিয়ে এই সুঁড়িপথটা সোজা পাহাড়ে চড়েছে। বেশ কিছু উঠে ডানদিকে কিছুটা গেলে ফলস্‌টা। ও সোজা উঠে গিয়ে যেখানে ফাঁদটা পেতে ছিল সেখানে পৌঁছল। কাছে গিয়ে বুঝতে পারল কিছুই পড়েনি। তবু একধার থেকে লতাপাতা শুদ্ধু বড় ডালটা তুলে ফাঁদের ভেতরটা দেখল। একটা সজারু কিংবা বেঁজিও তো পড়তে পারত। শালা, কপালটাই এমন। ডালটা নামিয়ে এদিক ওদিক দেখে ডান দিকে সরে গেল। একটা শালগাছের তলায় উইয়ের ঢিপি দেখে তার পাশে গিয়ে মনমরা হয়ে বসল। বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু গালটা চুলকে নিল, ওর স্বভাবমতো। তারপর পকেট থেকে একটা চুট্টা বার করে ধরাল। কিছুক্ষণ একমনে টেনে তড়াক করে মাথায় এল। তাড়াতাড়ি একমুঠো ধুলো নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঝুরঝুর করে ফেলল। হুঁ, পাহাড়ের ওপার থেকেই হাওয়া আসছে। চুট্টায় দুটান মেরে নিবিয়ে দিয়ে আবার ঢিপিটার পাশে গিয়ে বসল

আজ, একটা কিছু নিয়ে যেতেই হবে। দুদিন ধরে ফাঁদটা পেতেছে ও। কালকেও কিছু পড়েনি। আজওনা। কিন্তু আজ সুরতি হপ্তা পাবে। ও ঠিক করেছে আজকে রাতে সুরতি আর ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা ভোজ হবে। সুরতি, আজ ফেরার পথে চাল কিনবে ভাল দেখে আর মশলাপাতি। আজ একটা শিকার চাই-ই। শালা, মনরেগার কাজটা কমতে কমতে বন্ধই হয়ে গেল। না হলে কিছু পয়সা তো হাতে থাকতই। তা দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে চন্নুর দোকান থেকে নয় মাংসই কিনে নিত। এখন হাতে কোন কাজও নেই, টুকটাক ছাড়া। সুরতি তেওয়ারীজীর কারখানায় ডালের প্যাকেট করার কাজ করে আগে অন্যদের সঙ্গে প্যাকেট করত। পড়ালেখা জানে বলে ও এখন ওজন মেশিনে প্যাকেট ওজন করে আর হিসাব কষার সাউজীকে মুখে মুখে ওজন বলে।

সন্ধ্যের মুখে পাহাড় থেকে নেমে এল ও। শিকার না পাওয়ার খেদ ওর শরীর মন জুড়ে রয়েছে। শালা, ভোজটাই আজ হবেনা। বাসস্ট্যান্ডে সূরজ আর ছোটেলালের সঙ্গে দেখা হল। ওরা ডিব্বুর ওখানে যাচ্ছে। ওকেও ডাকল। কিন্তু ও জানে ডিব্বুর ওখানে মহুয়া খাওয়ার নাম করে নিয়ে গিয়ে ওরা ফুলুরি দিয়ে চোলাই খাবে। আজ আর কিছুই ভাল লাগছেনা ওর

ওর ঘরের সামনে এসে বেড়া ঠেলে দাওয়ায় উঠল মুংরুসুরতিকে কি বলবে। বাচ্ছাগুলোকেইবা কি বলবে। ঘর অন্ধকার। সুরতি গেল কোথায়? ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল। চাঁদের আলো জানলার বাঁখারির ফাঁক দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে। ও দেখল, সুরতি চৌকিতে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। বাচ্চাদুটো ওর পাশে শুয়ে। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ও আস্তে করে সুরতির পিঠে হাত রেখে নাড়া দিল। একি! সুরতির জামাটা পিঠের কাছটা ছেঁড়া। ও ব্যাকুল গলায় ডাকল, ‘সুরতি’, ‘সুরতি’। সুরতির পিঠটা চাপা কান্নার দমকে কাঁপতে লাগল। মুংরু ফিসফিসিয়ে বলল, ‘তেওয়ারীজী আজও তোকে......’।

ঘরের পিছনের ছোট্ট ক্ষেতের ধারে চুপ করে বসে আছে মুংরু, নিবে যাওয়া চুট্টাটা হাতে নিয়েকোথা থেকে একটুকরো মেঘ এসে দশমীর চাঁদকে ঢেকে দিতে থাকল।।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন